ধর্মে আছে অবতারের ভাবনা ! অবতার অর্থে স্বয়ং ভগবান যখন মানুষ হয়ে ওঠেন। একটু উল্টো করে ভাবলে এটা বলাই যায় কখনো কখনো মানুষও তার নিজ প্রতিভাবলে জীবনের কষ্টিপাথরে ঘষতে ঘষতে ভগবান হয়ে ওঠে। শ্রীচৈতন্য কিংবা শ্রীরামকৃষ্ণের জীবনে যেমন ভক্তিরসের অঝোর শ্রাবণ , দ্বাপরের শ্রীকৃষ্ণ কিন্তু সেই ভক্তিধারায় স্নান করতে পারেননি। রাজনীতির কঠিন সময়ধারা তার জীবনের সবটুকু নিঙড়ে নিয়েছিলো। বিনিময়ে মহাযুদ্ধ তাকে অভিষিক্ত করেছিল আর্যাবর্তের ভগবানের আসনে।
শ্রীকৃষ্ণ যখন দ্রৌপদীর সয়ম্বর সভায় পৌঁছেছিলো , ততদিনে ভারত রাজনীতিতে তার একটা আলাদা জায়গা তৈরী হয়েছে। ভারত রাজনীতিতে প্রবল প্রতাপসম্পন্ন রাজাদের পাশাপাশি উচ্চারিত হচ্ছে কৃষ্ণ , বলরামের নাম।  কিন্তু কৃষ্ণ বলরাম কোনোভাবেই কোনো রাজ্য , বা অঙ্গরাজ্যের রাজা ছিলেন না! বীরভোগ্যা  বসুন্ধরা।  কৃষ্ণ , বলরামের নাম হয়েছে বীর হিসেবে , নাম হয়েছে সাহসী মনোভাবের জন্য। কৃষ্ণ তখন ভারত আকাশে উজ্জ্ব্ল হচ্ছেন তার ত্রাতা ইমেজের জন্য।  কৃষ্ণ বেছে বেছে টার্গেট করছেন অত্যাচারী , স্বৈরাচারী রাজাদের। কংস ভীষণ ভাবেই বেপরোয়া এবং দুর্বিনীত ছিলেন। যাদব , ভোজদের কর্পোরেশন কায়দার সংঘ রাজ্যের সহজাত সেমী গণতান্ত্রিক ধারাকে তিনি ফুৎকারে উড়িয়ে স্বৈরাচারের কুৎসিত রূপ দেখাচ্ছিলেন।  কংস কে সরিয়ে সংঘ রাজ্য ফিরিয়ে দিয়ে , এবং উগ্রসেনকে রাজা করে যে জনপ্রিয় ইমেজ কৃষ্ণ তৈরী করেছিলেন সেই ইমেজকেই কৃষ্ণ জীবনভর লালন করেছেন। কংস বধের পরেই কৃষ্ণ বলরাম তাদের গুরুজনদের ইচ্ছেয় সন্দীপনী মুনির কাছে অস্ত্র এবং নীতি, ধর্মের শিক্ষা নেন। এরপরেই জরাসন্ধের একের পর এক ভয়ঙ্কর আক্রমন ধেয়ে আসতে থাকে। প্রাথমিক ভাবে গোটা মথুরাকে অবরুদ্ধ করে কৃষ্ণ বলরামকে শায়েস্তা করবার জন্যে সুবিশাল বাহিনী নিয়ে যুদ্ধে আসেন স্বয়ং জরাসন্ধ। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে পান্ডব কৌরব মিলে  মোট যত সংখ্যক সৈন্য ছিলেন তার থেকেও বেশি সৈন্য নিয়ে মথুরা আক্রমন করেন জরাসন্ধ। সাথে ভারতবর্ষের শ্রেষ্ট বীরেরা। এ হেন্ যুদ্ধের সামনে দাঁড়িয়ে কৃষ্ণের সমরসজ্জাটাও পরখ করতে হবে। কংসের সে অর্থে শক্তিশালী সেনাবাহিনীর দরকারই ছিল না, কারন শশুর জরাসন্ধের বিরাট প্রতিপত্তি ও সুবিশাল মিত্রশক্তি।  কংসের সেনাবাহিনী নিয়মিত সমরচর্চার এভাবে জরাসন্ধের অভিনয়ের সামনে ফুৎকারে উড়ে যাবার মতো. মথুরা নগরীর চারদিকের পরীক্ষা বহুকাল সংস্কার হয় নি। সে অর্থে কোনো দুর্গ নেই।  এই যুদ্ধের ফলাফল এক নিমেষেই আন্দাজ করে নেওয়া যায়।  কিন্তু অবিশ্বাস্য ভাবেই ঘটনাকে নিজের দিকে টেনে আনলেন কৃষ্ণ। কৃষ্ণ জানতেন জরাসন্ধের মূল টার্গেট সে নিজে এবং দাদা বলরাম। দাদা বলরাম অসীম বীর , সে নিজেও কম নয়। স্রেফ বুদ্ধি আর শক্তির মিশেল ঘটিয়ে বারবার জরাসন্ধ কে ফিরিয়ে দিতে শুরু করলেন কৃষ্ণ বলরাম। কৃষ্ণ নিজেই অনেক পরে যুধিষ্ঠিরের কাছে বলেছেন তিনশো বছর টানা যুদ্ধ করলেও জরাসন্ধকে হারানো যেত না. কৃষ্ণ তাই জরাসন্ধের বিরাট সৈন্যবাহিনীকে নিজের পিছনে লেলিয়ে দিয়ে পালিয়ে বেড়িয়েছেন।  সাথে দাদা বলরাম। এখানে দুটো জিনিস নজর রাখবার এক হলো জরাসন্ধের মূল টার্গেট যেহেতু কৃষ্ণ এবং বলরাম , তাই জরাসন্ধ বারবারই আপন অহংকারে পুরো সেনাবাহিনীর অভিমুখ ঘুরিয়ে কৃষদের তারা করেছেন।  ফলে মথুরা নগরী অবরোধ মুক্ত হয়েছে। আর জরাসন্ধের যত বোরো বাহিনীই থাকুক না কেন পাহাড় জঙ্গল ঘেরা ভারতের পশ্চিমে কৃষ্ণের মত এক চতুর বীরকে তার অসীম বলশালী দাদা বলরাম সমেত ঘরে ফেলা কার্যত অসম্ভব ছিল।  এরকম ছায়া যুদ্ধ চলতে চলতে কৃষ্ণ অর্জন করেন যাদবদের হৃদয় আর জরাসন্ধ ফাস্ট্রেশন।  কৃষ্ণ ঠিক করেন মথুরায় থেকে জরাসন্ধের মোকাবিলা দুস্কর।  নিজেই খুঁজে বের করেন এবং গোটা রাজত্বকে সরিয়ে নিয়ে দ্বারকায়।  অপেক্ষাকৃত সুরক্ষিত নগরী। এর মাঝেই একটি ভয়ানক ঘটনা আছে। কৃষ্ণ খবর পান তাদের বিরুদ্ধে সমরসজ্জা করছেন জবনরাজ কালযবন। তখন মথুরা থেকে দ্বারকা  যাবার প্রস্তুতি চলছে। কৃষ্ণ এবারও সুচতুর কৌশলে সম্মুখ সময় এড়িয়ে গেলেন এবং বেশ কিছুটা সময় নষ্ট করলেন। প্রথমে একটি কলসীতে একটি কেউটে সাপ  ভরে কালজবনের কাছে পাঠিয়ে দিলেন কৃষ্ণ।  ভাবটা এমন যেন কেউটে সাপের সাথে লাগতে এস না।  বিষয়ে পুরো শেষ হয়ে যাবে। কালজবন যে এই সামান্য কলসি দেখে ভয় পাবার রাজা নন কৃষ্ণ ভালো মতো জানতেন।  কালজবন  সেই কলসিতে বুনো পিঁপড়ে ভরে  ফেরত পাঠিয়ে দিলেন।
চলবে-
Facebook Comments