মানুষের মনে চিরকালই বঞ্চিত মানুষের জন্য একটা সফট কর্নার থাকে। আর বীরপূজার চিরায়ত অভ্যাসে আমরা চিরকালই সেই মানুষটার গলায় বিজয়মাল্য তুলে দি যে বঞ্চনার পাহাড় ঠেলে জীবনযুদ্ধের ডার্ক হর্স হয়ে আলটিমেটলি শ্রেষ্ঠত্বের শিরোপা  তুলে নেয়। মহাভারতের মহাকাব্য অনেকটা যেন সেই সুরেই বাধা। মহাভারতের অসংখ্য সংস্করণ এবং তার একাধিক ব্যাখ্যা থেকে যে যুক্তিনিষ্ঠ ঐতিহাসিক কাহিনী চিত্র উঠে আসে তা  কিন্তু কাউন্টার আটাকের গল্প। 

মহাভারতের ঘটনা ধারা যেভাবে এগিয়েছে তাতে পাণ্ডবদের জন্য পাঠকের মনে একটা নরম জায়গা আসতে বাধ্য । পাঁচ ভাই। ছোটবেলাতেই বাবাকে হারিয়েছে। প্রথম থেকেই একাধিক চক্রান্তের স্বীকার। মহাযুদ্ধের অনেক আগেই জতুগৃহে পুড়ে মারা যাবার কথা যাদের। যতবার মাথা তুলতে গেছেন হস্তিনাপুরের অপরাজেয় রাজশক্তি ছলে বলে কৌশলে তাদের রাজনৈতিক কেরিয়ার শেষ করতে মরিয়া পদক্ষেপ নিয়েছে।  পাণ্ডবদের অসহায় অবস্থা বোঝাতে এখানে আরো দুটি তথ্য এখানে  খুব গুরুত্বপূর্ণ। এক অপরাজেয় দুই বীর ভীষ্ম এবং দ্রোণাচার্য যতই পাণ্ডবদের প্রতি স্নেহশীল থাকুন না কেন তারা হস্তিনাপুরের রাজশক্তির অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে ধৃতরাষ্ট্রের ক্ষমতালোভী ছেলেদের পক্ষেই অস্ত্র ধরেছেন। অন্যদিকে যে সময় জতুগৃহ থেকে কোনোক্রমে বেঁচে জীবন কাটাচ্ছেন মাতা কুন্তী সহ পান্ডব পুত্রেরা , তখন গোটা ভারত জুড়েই প্রবল প্রতাপে রাজত্ব চালাচ্ছেন কৌরবদের মিত্রশক্তিরা। ফলে পাণ্ডবদের পক্ষে রাজত্ব ফিরে পাওয়াতো অনেক দূরের কথা জীবন ধারণই ছিল কঠিন। অথচ পান্ডুর পুত্রদের এমন দুর্দশা মোটেও প্রাপ্য নয়। মহাভারতের কোনো অংশেই পাণ্ডবদের অকারণে যুদ্ধ বিগ্রহে জড়াতে দেখা যায় নি। বড়ভাই যুধিষ্ঠির তো ঋষিতুল্য মানুষ।  বাকি পান্ডবেরাও কেউই রাজত্ব কিংবা ধন  সম্পদের ব্যাপারে বিশাল কিছু আগ্রহী  ছিলেন এমন মনে হয় না।  তাদের জীবনের একটাই ট্রাজেডি।  পান্ডুর বড়ছেলে যুধিষ্ঠির বয়েসে দুর্যোধনের থেকে বড়।  ফলে রাজত্বের দাবিদার।  এই রাজসিংহাসনে বসার সম্ভাবনাই ভয়ঙ্কর ট্রাজেডি হয়ে পান্ডুর ছেলেদের তাড়া করেছে বহুদিন। অন্যদিকে ভীম অসম্ভব শক্তিশালী একজন মানুষ আর অর্জুন ভুবনজয়ী ধনুর্ধর।  কিন্তু এই মাত্র দুজনের শক্তিতে সিংহাসন ফিরে  পাওয়া যায় না। কারণ দুর্যোধনের ছেলেদের পক্ষে তখন ভারতের রাজা রাজড়াদের মহাজোট। গল্পের ঠিক এই খানেই পাণ্ডবদের জীবনে আসেন এক বিস্ময় পুরুষ। যার বিস্ময়কর ট্যালেন্টের কারণেই তাকে সমকালতো বটেই এমনকি তার পরের অনন্ত সময়ধারা তাকে ভগবানের আসনে বসিয়ে পুজো করেছে।   বঞ্চনার ইতিহাস তার জীবনেও কম নয়। রাজপরিবারের সন্তান হয়েও পালিত হয়েছেন গোপগৃহে।  সেখানে তার স্নেহ মমতার অভাব না হলেও শৈশব থেকে রাজকীয় অস্ত্র শিক্ষা বা রাজনীতির কলাকৌশল শেখার ভাগ্য তার হয় নি। অল্প বয়েসেই অবশ্য  বুদ্ধি এবং শক্তির পরিচয় দিচ্ছিলেন তিনি।  পদে পদে বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন ভারত ভূখণ্ডে জন্মেছেন সর্বকালের শ্রেষ্ট ব্যক্তিত্ব।  শৈশবের সেই সব গল্পে অতিরঞ্জন আছে। থাকা খুব স্বাভাবিক ও। কিন্তু ইটা খুব পরিষ্কার ছোটবেলা থেকেই তুখোড় বুদ্ধির প্রয়োগে যুদ্ধবিদ্যার অনেকটাই তিনি নিজে নিজেই শিখে নিয়েছিলেন। যাই হোক শৈশবের গোপাল ঠাকুর একদিন কিশোর হলো।  কৈশোরের প্রেমিক চূড়ামনিকে ভাবিকাল রোমান্টিসিজম এর চূড়ান্ত স্তর থেকে আচমকা ফেললো রাজনীতির ভরা মঞ্চে ।  সেখানে স্বশিক্ষিত যুদ্ধবিদ্যা এবং কূটনীতির প্রয়োগে অত্যাচারী মহারাজ কংসকে মুছে দিয়েছেন কৃষ্ণ।  
যাদবদের রাজ্যশাসনের সিস্টেম ছিল ভারতের অন্যান্য রাজশক্তির থেকে আলাদা।  তারা অনেকগুলো ছোট ছোট গোষ্ঠীর মাধ্যমে দেশ চালাতো।  অনেকটা কর্পোরেশন কায়দায়।  গোষ্ঠীপতিদের সংখ্যাগরিষ্ঠের সমর্থন আগে থেকেই কৃষ্ণের দিকে ছিল।  বলাই বাহুল্য অত্যাচারী কংসের ভাবধারা সংঘপতিদের না পসন্দ ছিল।  শুধু তারা খুঁজছিলেন একজন মহানায়ককে , যার মাধ্যমে কংসকে সরানো যাবে। কৃষ্ণকে আশ্রয় করে সে মুশকিল আসান হলো বটে।  কিন্তু সেই মুশকিলের আড়ালেই লুকিয়েছিল নতুন সমস্যা। কংসের ভয়াল বাড়বাড়ন্তে আগেই হয়তো সংঘপতিরা  ব্যবস্থা নিতে পারতেন , কিন্তু মুশকিল ছিল কংসের আত্মীয়তার সূত্রে পাওয়া বিরাট মিত্রশক্তি। তখন ভারতের রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রাণকেন্দ্র ছিল মগধ। মগধের রাজা জরাসন্ধ সম্পর্কে কংসের শশুর মশাই।  কংসের বাড়বাড়ন্তের মূল কারণ সেটাই।একে  প্রবল পরাক্রমী জরাসন্ধ আর তার পাশে দাঁড়াবার মতো বিরাট রাজশক্তি। এখানে উল্লেখ  করতে হবে হস্তিনাপুরের দুর্যোধনরাও কিন্তু তখন জরাসন্ধের তথা কংসের মিত্রশক্তি তে ছিল। বিনিময়ে দুর্যোধনের পেয়েছিলেন জরাসন্ধ গ্রূপের সমর্থন।  এ হেন্ কংসকে মুছে ফেললে অবধারিতভাবে জরাসন্ধ তার মিত্র শক্তি নিয়ে মথুরা আক্রমণ করবেন এ দিনের আলোর মতো পরিষ্কার। এই অবধারিত সত্যের সামনে দাঁড়িয়ে শ্রীকৃষ্ণ কি করলেন সেটাই দেখবার। প্রথমত কংস পরবর্তী শূন্যস্থানে সংঘরাজ্যের অধিপতি করলেন কংসের পিতা  উগ্রসেনকে। এই সিদ্ধান্ত প্রবল ভাবেই স্ট্র্যাটেজিক। বয়স্ক উগ্রসেনকে মেনে নিলেন সব সংঘপতিরাই।  উগ্রসেনকে রাজা করে নিজস্ব কায়দায় সব যাদব সাত্বক , ভোজ বীরদের নিজস্ব সংঘ টিকিয়ে রেখেই এক ছাতার তলায় এনে ফেললেন কৃষ্ণ।উগ্রসেন রাজা হলেও যাদব কুলপতিদের অধিকাংশের ওপর নিরঙ্কুশ আধিপত্য ছিল কৃষ্ণের। তারপর একজোট হয়ে জরাসন্ধের মোকাবিলা শুরু করলেন।  এই মোকাবিলার  গল্পটা মোটেও এলাম দেখলাম জয় করলাম এর নয়। জরাসন্ধের বাহিনী কৃষ্ণের বাহিনী থেকে অনেক শক্তিশালী ছিলো। কৃষ্ণকে এর পরের সময়টায় অসম্ভব স্ট্রাগল করতে হয়েছে। এমনকি অসম্ভব ধৈর্য সহকারে তিনি অপেক্ষা  করেছেন। মাঝে মাঝে পিছু হটেছেন।  কখনো বীরত্ব , কখনো স্রেফ বুদ্ধি দিয়ে শত্রু পক্ষকে হটিয়ে ধীরে ধীরে জমি তৈরী করেছেন প্রত্যঘাতের । এই সময়েই দ্রৌপদীর সয়ম্বর সভায় পাণ্ডবদের প্রথম দেখেন কৃষ্ণ। যদিও একথা সুস্পষ্ট করে বলা যায় পাণ্ডবদের সম্পর্কে আগে থেকেই কৃষ্ণের মনে গভীর কৌতুহল  ছিলো । সেই আগ্রহের পিছনে একাধিক সুস্পষ্ট কারণ আছে ।  এক পাণ্ডবরা কৃষ্ণের আত্মীয় , পিসির ছেলে। দ্বিতীয়ত পাণ্ডবদের বীরত্ব এবং বঞ্চনার দুই গল্পই কৃষ্ণের জানা ছিল। ফলে কৃষ্ণ বুঝেছিলেন ভবিষ্যতে পাণ্ডবদের সাথে তার জোট অবশ্যম্ভাবী। কৃষ্ণ তার বিশস্ত সহযোগী সত্যকির সাথে নিজে গিয়ে বারানাবাতের জতুগৃহ পরীক্ষা করে এসেছেন।  কৃষ্ণ আগে থেকেই নিশ্চিত ছিলেন পাণ্ডবেরা কোনোভাবে বেঁচে গেছেন জতুগৃহ থেকে। কৃষ্ণের নিজের জমি তখন একশো শতাংশ মজবুত হয় নি। মথুরার থেকে অপেক্ষাকৃত নিরাপদ ভৌগোলিক অবস্থানের দ্বারকায় যাদব রাজত্ব  সরিয়ে নিয়ে গেছেন তিনি। এটা  ঠিকই যে জরাসন্ধের মতো প্রবল পরাক্রমী রাজা এবং তার অপরাজেয় মিত্রশক্তিকে নানা কায়দায় ঠেকিয়ে রেখে ততদিনে জনমানসে তিনি যথেষ্ট পরাক্রমী বীরের তকমা পেয়েছেন। জরাসন্ধের পুত্রসম শিশুপালের বাগদত্তা রুক্মিনীকে বীরোচিত কায়দায় হরণ করে বিয়েও সেরে ফেলেছেন।  সবই ঠিক , কিন্তু তবুও জরাসন্ধ এবং তার মিত্রশক্তি তখনও সক্রিয়। যে কোনো মুহূর্তে আবারো আঘাত আসতে পারে জরাসন্ধের তরফে।  এই রকম একটা সময়ই হয়ে উঠলো ইতিহাসের টার্নিং পয়েন্ট।  দ্রৌপদীর সয়ম্বর সভা থেকেই সকলের অজান্তে এমন এক বীজ বপন হলো , যার থেকে মিশে গেলো পান্ডব রাজপুরুষদের সাথে পাঞ্চাল রাজশক্তি এবং কৃষ্ণের অসামান্য রাজনৈতিক প্রজ্ঞা এবং শক্তি। অপরাজেয় হস্তিনাপুরের কিংবা মগধরাজ জরাসন্ধের উল্টোস্রোতে মিশে গেলো তিন বঞ্চিত শক্তিধারা।  তৈরী হলো ভারত রাজনীতির নতুন এলায়েন্স। 
আমাদের গল্পের শুরুয়াদ সেই স্বয়ম্বর সভা থেকেই। যারা কেন্দ্রে এক  অগ্নি কন্যা। 
ক্রমশ –
Facebook Comments