আগের অংশগুলো পড়তে ক্লিক করুন-
http://asmania.net/2017/07/02/shammi-1/
http://asmania.net/2017/07/09/shammi2/
http://asmania.net/2017/07/17/shammi-3/

সেই রাতটা যেন স্বপ্নের ডানায় ভর করে কেটে গিয়েছিল। খেতে বসে কৃষ্ণার সঙ্গে পোশাকি আলাপটাও হয়ে যায়। তখনই জেনেছিল দিল্লির বসন্তকুঞ্জে বাবা মার সঙ্গে থাকে কৃষ্ণা। বাবা একজন সরকারি আমলা। পেশাগত কারণে দেশের বাইরে গেছেন সুবিমল রায়।তাই মায়ের সঙ্গে গ্রামের বাড়িতে এসেছে কৃষ্ণা। সুবিমলবাবু ফিরলে এবার তারা কলকাতায় সেটল করবে। তবে তারজন্য ব্যস্তসমস্ত হয়ে কিছু করার দরকার নেই। দক্ষিণ কলকাতায় তাদের একখানা ফ্ল্যাট আছে। সেটার একটু ভোল বদলে নিলে কাজ চলে যাবে। কৃষ্ণার এখন বাবার ফেরার অপেক্ষা। এরপর নতুন স্কুলে ভর্তি হওয়া, আরও কত কাজ। এসব ভাবতে ভাবতেই প্যাডেলে চাপ দেয় শুভ। মকটেস্টের প্রস্তুতি নিয়ে দিনকতক বেশ ব্যস্ত ছিল সে। সামনেই ক্লাসের বার্ষিক পরীক্ষা। এরপর হাওয়ায় ভর করে সময় যেন উড়ে চলল। পরীক্ষার পর মধুপুরে বড়দাদুর বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে ঘোরাঘুরির থেকে পড়াটাই বেশি হল। ক্লাস টেনের অর্ধেক সিলেবাস সম্পূর্ণ করে অবন্তীপুরে ফিরল শুভ। তারপর জোরকদমে প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেল। রাতদিন এক করে পড়াশোনা করা। এখন আর স্কুল বা প্রাইভেট টিউশন নয়। বা়ড়িতে বসে শুধু ভালো করে পুরোনো পড়াগুলো ভালো করে আত্মস্থ করা। এর মধ্যে একদিন মায়ের সঙ্গে ঝিলপাড়ের মার্কেটে যাওয়ার সময় কৃষ্ণার সঙ্গে শুভর দেখা হয়ে গেল। শুভ শুধু এটুকু জানতে পেরেছে, বিশেষ কারণে অবন্তীপুর মিশনারি স্কুলে ভর্তি হয়েছে কৃষ্ণা। রায় বাড়িতেই থাকছে। এরপর হুড়মুড় করে পরীক্ষা চলে এলো। শেষ পরীক্ষার দিন বাবা হইহই করে বাড়ি ফিরলেন। শুভরও মনে আনন্দ ধরে না। দিনদুয়েকের মধ্যেই সে বরফের দেশে হাজির হবে। এ তার অনেকদিনের স্বপ্ন। বাবা বলেছিলেন মাধ্যমিক পরীক্ষা হয়ে গেলেই তারা কাশ্মীর বেড়াতে যাবে। শুভরও আর তর সইছে না। ঘুরে এসে নতুন ক্লাসে পড়ার প্রস্তুতি নিতে হবে। বাবা বদলির অর্ডার পেয়ে গেছেন। অবন্তীপুর ছেড়ে এবার কলকাতায় থাকবে তারা।

শুক্রবার দিন দু্গ্গাদুগ্গা বলে তিনজনে জম্মু তাওয়াইয়ে চড়ে বসল। এরপর এক অজানার আনন্দে ভেসে চলা। তবে আনন্দের শেষটা এমন যন্ত্রণায় ডুবে যাবে কেই বা ভেবেছিল। তাই বাবাকে ছাড়াই সাদা শাড়ির মাকে নিয়ে অবন্তীপুরে ফিরে এলো শুভ। তখন রেজাল্ট বেরোতে বেশ খানিকটা দেরি আছে। শ্রাদ্ধশান্তি মিটলে দাদু এসে তাদের কলকাতায় নিয়ে গেল। রেজাল্ট বেরোলে দিনদুয়েকের জন্য অবন্তীপুরে এসেছিল শুভ। তবে বন্ধুদের কারোর সঙ্গেই তেমনভাবে দেখা হয়নি। কৃষ্ণার সঙ্গেও না। ফাটাফাটি রেজাল্টের কারণে হিন্দুস্কুলে ভর্তি হতেও কোনও সমস্যা হয়নি। তবে বাবার আদর মাখা হাতটা যে হারিয়ে গেছে তা একদিনের জন্যও বুঝতে দেননি দাদু-দিদা, বড়দাদু। মা যেন কেমন হয়েগেছিল। শাসনের ঘেরাটোপে শুভকে শুধু নিষ্ঠার পাঠ আর বাবার ইচ্ছেকে মনে করিয়ে দেওয়া এই ছিল মায়ের কাজ। সময় কারোর জন্য বসে থাকে না। দেখতে দেখতে দুবছর কেটে গেছে। মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে যাদবপুরে ভর্তি হয়েছে শুভ। সন্ধ্যেবেলা টিউশনি পড়িয়ে তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরছিল শুভ। দাদুকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে হবে। মাসখানেক ধরে হরিহর বাড়ুয্যের শরীরটা ভালো যাচ্ছে না। তাই নাতির ফেরার আশায় ড্রয়িংরুমেই বসেছিলেন। পাশের ঘরে বসে একমনে ছেলের জামাকাপড় গোছাচ্ছিলেন রজনীদেবী। ফের টিপটিপ বৃষ্টি শুরু হয়েছে। আচমকা লোডশেডিং হতেই বিরক্তিতে মোমবাতি খুঁজতে গেলেন। বাসের জন্য এইটবি তে দাঁড়িয়ে আছে শুভ। বৃষ্টির ভাবগতিক দেখে চিন্তায় পড়ে গেছে। এমনটা চলতে থাকলে হাতিবাগান ফিরতে তার বেশ রাত হয়ে যাবে।কী করে যে দাদুকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবে। বাস স্ট্যান্ডের শেডের নিচে তখন অফিসফেরতা যাত্রীদের ভিড়। এর মধ্যেই জল জমা শুরু হয়েছে। সামনেই রাস্তার পিচ খানিকটা ভেঙে যাওয়ায় জল জমেছে। সেই জল বাঁচিয়ে একটা কালো রঙের হন্ডাসিটি এসে দাঁড়াল। এই বৃষ্টিতে ভিড়ের মধ্যে থেকে সেই ভাগ্যবানটিকে খুঁজে বের করার চেষ্টা করল শুভ। হঠাৎ দেখল গাড়ির মধ্যে থেকে একটি সুন্দর হাত তাকেই ডাকছে। এদিকওদিক ঘুরে শুভ ব্যাপারটা এড়িয়ে যেতে চাইল। কেননা কলকাতা শহরে এমন কোনও আত্মীয়া তাঁর নেই যিনি এই বাদলা দিনে তাকে স্বেচ্ছায় লিফট দেবে। এদিকে আশপাশের পথচারীদের মধ্যে থেকে তখন গুঞ্জন শুরু হয়েছে। একজন তো বলেই ফেললেন যান না দাদা। সাধা লক্ষ্ণী পায়ে ঠেলতে নেই। তবে তীর্যক হাসিটাও চোখ এড়াল না শুভর। মনে মনে সেই হাতের মালকিনের উপরেও বেজায় রেগে গেল সে। তবে হাসির খোড়াক হতে তার মোটেও ভালো লাগছিল না। তাই গাড়িতে উঠে বসতেই চালক থানার দিকে গাড়ি ছুটিয়ে দিল। একদিক থেকে ভালোই হয়েছে। বাড়ি পৌঁছতে বিশেষ বেগ পেতে হবে না। সেলিমপুরে সিগন্যালে গাড়ির গতি কমলেই টনক নড়ে শুভর। এটা কার গাড়ি ?  ওই মহিলাই বা কে ?  এতক্ষণ নিজের মনে ডুবে থাকায় মহিলাকে খেয়াল করেনি। ততক্ষণে তারই দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছেন সেই সুবেশা যুবতি। কিছু না ভেবেই চোখ নামিয়ে নিল শুভ। মাসিকে বলুন খিচুড়ি রান্না করতে। সঙ্গে পাপড় যেন থাকে। সহযাত্রীর এ হেন আবদারে কৈশোরের এক বর্ষণ মুখর রাত যেন সহসা ফিরে এলো। ঘাড় ঘুরিয়ে মুখের দিকে তাকাতেই অষ্টমীর আলতা রাঙানো পা দুখানা কোথা থেকে যেন জায়গা করে নিল। কৃষ্ণা! বাবা চলে গেছেন সাত বছর। অবন্তীপুর ছেড়ে আসার পর এক শহরের বাসিন্দা হলেও কৃষ্ণার সঙ্গে শুভর আর দেখা হয়নি। এতদিন বাদে যুবতি কৃষ্ণাকে চিনতেই পারেনি সে। এরমধ্যে কখন পাড়ায় পৌঁছে গেছে বুঝতে পারেনি। গোটা রাস্তায় একটাও কথা হয়নি তাদের। পুরোনো দিনের স্মৃতিতেই ডুবেছিল দুজনে। বাড়ির ঠিকানাটাও বলেনি। তবে পাড়ার মোড়ে গাড়ি থামতেই অবাক হল শুভ। কিছু ভাবার আগেই কৃষ্ণা তাড়া দিতে গাড়ি থেকে নেমে পড়ল সে। বাড়িতে পৌঁছে দেখে সবাই তাদের জন্য অপেক্ষা করছে। এমনকী, ছোটোদাদু অসুস্থতা ভুলে বারান্দায় পায়চারি করছেন। পায়ের শব্দ পেয়ে ডাকাডাকি শুরু করতে মা ও দিদা চলে এল।

 

খিচুড়ি খেতে বসে জানা গেল টেলিফোন ডাইরেক্টরি ঘেঁটে শুভর দাদুর বাড়ির ঠিকানা জোগাড় করেছে কৃষ্ণা। বেশ কিছুদিন ধরে ফোনে কথাও হয়েছে। তাকে সারপ্রাইজ দিতেই আজকের এই প্ল্যান।দাদু দিদা মা সকলেই জানত আজ বাড়িতে কৃষ্ণা আসবে। মনে মনে খুশি হলেও আগেভাগে খবরটা না পাওয়ায় দিদার উপরে বেজায় চটল শুভ। তবে মুখে কিছুই বলল না। এরপর মাঝেমাঝে দুজনের দেখা হতে থাকল। মাকে কিছুই লুকোয় না শুভ। তাই রজনীদেবীর জানতে বাকি থাকল না ছেলের মনের কথা। কিন্তু রায়বাড়ির অহংবোধের কথা মনে পড়েই নিজে থেকে গুটিয়ে গেলেন তিনি।বাবাহারা ছেলেকে নতুন করে দুঃখ দিতে মন সায় দিল না। ছেলে বিষয়টি নিয়ে কথা পাড়ার আগেই তাকে সমঝে দিলেন তিনি। ইউনিভার্সিটির পড়া শেষ হতেই মধুপুরে চলে গেল শুভ। বেশ কিছুদিন বড়দাদুর কাছে থেকে কৃষ্ণার সঙ্গ ভুলতে চাইল সে। ছেলের এমন বিবাগী আচরণ রজনীদেবীর চোখ এড়াল না। তবু বুক ফাটলেও মুখে কিছু বললেন না। এরমধ্যে ক্যাম্পাস ইন্টারভিউ দিয়ে ব্যাঙ্গালোরে চাকরি জুটিয়ে ফেলল শুভ। ছেলেকে দূরে ছাড়তে ইচ্ছে না থাকলেও বাধা দেননি রজনীদেবী। হরিহরবাবু ও শ্যামাসুন্দরীদেবীও মেয়েকে বোঝালেন। ছেলেকে আর কতদিন কাছে ধরে রাখা যাবে। তাকে তো জগৎটাকে চিনতে হবে। মেয়েকেও নাতির সঙ্গে পাঠাতে চেয়েছিলেন। তবে দাদু দিদার এ হেন আবদারকে শুভ বা তার মা কেউই প্রশ্রয় দেননি। বছর দুয়েক সেখানে কাটানোর পর গত জুনে কলকাতা ফিরেছে শুভ। এরমধ্যে বড়দাদু গত হয়েছেন। মধুপুরের বাড়ি ঘরদোর অভিভাবকহীন পড়ে আছে। হরিহরবাবুও আজকাল আর মনে জোর পান না। তাই নাতি ফিরতে তাঁর মুখেও হাসি ফিরেছে। কদিন আছেন জানেন না। জ্ঞান থাকতে থাকতে নাতিকে সবকিছু বুঝিয়ে দিয়ে যেতে চান। তাঁদের একমাত্র মেয়ে রজনীর বিয়ে দেওয়ার পরই ভেবেছিলেন বয়স বাড়লে দুটিতে কাশীবাসী হবেন। কিন্তু জামাইয়ের অকালপ্রয়ানে তাতে ছেদ পড়ে। মেয়ে ও নাতিকে বুক দিয়ে আগলে রেখেছেন। তবে দিন যে ফুরিয়ে আসছে তা ভালোই টের পান।

এরমধ্যেই কলকাতা অফিসে জয়েন করেছে শুভ। তবে তারপর থেকে বৃষ্টির যেন বিরাম নেই। পাঁচদিনের টানা বৃষ্টিতে শহরটা ডুবতে বসেছে। কাল রাত থেকে অঝোরে ঝরছে। ন’টা প্রায় বাজে ছেলেটা কী আজ বেরোবে না। সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে শুভর ঘরের দিকে পা বাড়ান রজনীদেবী। এদিকে আচমকা অ্যালার্ম টা বাজতেই স্বপ্নটা ছিঁড়ে যায়। মায়ের ডাকে হুড়মুরিয়ে উঠে বসে শুভ। ছেলেকে এমনভাবে উঠতে দেখে রজনীদেবীর মায়া হল। ভূস্বর্গে এক পথদুর্ঘটনায় ধীমানবাবু চলে যাওয়ার পর থেকে একটা দম দেওয়া পুতুলের মতো ছেলেকে বড় করেছেন তিনি। একদিনের জন্যেও মায়ের কথার অবাধ্য হয়নি ছেলেটা। এদিকে বিছানায় বসতেই খিচুড়ির আবদার করে ফের মায়ের কোলে শুয়ে পড়ে শুভ। এটুকু আবদার রাখতে যেন তৈরিই ছিলেন রজনীদেবী। শুভকে ওঠার তাড়া দিয়ে রান্নাঘরে চলে যান। বিছানার মায়া ত্যাগ করে ততক্ষণে বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছে শুভ। বৃষ্টির জলে হাত বাড়িয়ে দিয়ে সদ্য ভাঙা স্বপ্নটাকে খুঁজতে ব্যস্ত তার ব্যাকুল মন।                                             সমাপ্ত…

 

শাম্মী

শাম্মী

বেশ কিছু বছর ধরেই পেশাগত সাংবাদিকতা জীবনের পাশাপাশি গল্প , কবিতা লেখালিখি করেন। ইতিমধ্যেই তার একাধিক লেখা বহু মানুষের কাছে উচ্চ প্রসংশিত। 

Facebook Comments