বাংলার এখন রোজকার জীবন বেশ তিতকুটে , পানসেও বলা চলে। বঙ্গকুমার ও কুমারীদের এখন মিষ্টিতে রুচি নেই। জিমে ক্যালোরি ঝরিয়ে , সিদ্ধ কিংবা অর্ধসিদ্ধ আন্ডার ফান্ডায় – জীবন যতই দ্রুতগামী হোক না কেন – বঙ্গ জীবনের সে রস আর নেই। কষে পাঁঠার মাংস রাঁধলে কোলস্টেরল চোখ রাঙায়। আর খান দশেক রসগোল্লা পাকস্থলীতে ক্যুরিয়ার করলে সুগার বাবাজীবন ফানসের মতন উর্ধগামী হন। এভাবে কি আর দিন চলে ! পড়তির দিনে স্মৃতিই ভরসা। রসগোল্লার রসে টাইম মেশিনে চেপে ডুব সাঁতার দিয়ে উঠলাম। 
দেখুন সোজা কোথায় বলি , খাওয়া ঐ জিহ্বা পর্যন্তই মানে যেটুকু স্বাদেন্দ্রিয় সক্রিয় থাকে ! তারপর খাদ্যনালীর সরু পথ বেয়ে পাকস্থলীর দরজা টেনে খুলে অন্ত্র মন্ত্র হাজারো গলিঘুজিতে উৎসেচক নামক বস্তুর ককটেলে খাদ্যের যে পরিক্রমা তাকে একসময়ের বাঙালিরা খাওয়া বলে মানতেনই না। তারা বলতেন জিহ্বার পর খাদ্যের বাকি পথ চলা নিতান্তই শারীরবৃত্তির প্রক্রিয়া। তো সেই কথাই যদি মানেন অর্থাৎ জিহ্বার স্বাদই যদি খাদ্যগ্রহণের মুখ্য কারণ হয় তবে ডায়েট চার্টের আজ ছুটি। দু আঙুলে ধরুন আর মুখে পুড়ুন রসসিক্ত সেই গোলকটিকে – যার প্রেমে দশক – শতকের হিসেব ওলট – পালট করে – আবাল বৃদ্ধ বণিতা পাগল। এক ও একমাত্র রসগোল্লা। 
রসগোল্লার জন্ম এই অনন্য মিষ্টির স্বাদের মতই রহস্যপূর্ণ। জগন্নাথ প্রবাদ বলে – রথযাত্রায় যাবার আগে মহাপূজ্য জগন্নাথ তার অর্ধাঙ্গিনী লক্ষী মায়ের অনুমতির তোয়াক্কাই করেননি। কদিনের অনুপস্থিতিতে লক্ষীর মন অভিমানে সিক্ত। ফিরে এসে জগন্নাথ বুঝলেন এতো মহা মুশকিল ! তখনও বাজারে আইসক্রিম বা চকোলেটের চল হয়নি। জগন্নাথ এক অভিনব মিষ্টি তুলে দিলেন লক্ষীর মুখে। স্বাদের মহিমায় লিখির রাগ গলে জল। মিষ্টির নাম ক্ষীরমোহন। উড়িষ্যার বর্তমান কালের গবেষকরা বলছেন – এই ক্ষীরমোহনের বিবর্তিত রূপ রসগোল্লা। রসগোল্লার প্রাচীনত্ব এবং উড়িষ্যা কানেকশন বোঝাতে গবেষকদের মূল হাতিয়ার – পঞ্চদশ শতকের আশেপাশে রচিত ডান্ডি রামায়ন গ্রন্থ। ডান্ডি রামায়ন মূল বাল্মীকি রামায়নের উড়িষ্যা ভার্সন। বলাই বাহুল্য এই ধরণের গ্রন্থে মূল কাহিনীর শিরায় শিরায় স্থানীয় রীতি নীতি খাবার দাবার ঢুকে পড়ে। ডান্ডি রামায়নে রসগোল্লার উপস্থিতি আছে। সেই সূত্রেই গবেষকদের জোরালো দাবী পঞ্চদশ শতকের সমকালেই উড়িষ্যাতে রসগোল্লার উপস্থিতি ছিল। 
বঙ্গদেশ অবশ্য মনে প্রাণে বিশ্বাস করে বাঙালির শিরায় শিরায় প্রবাহিত রক্তরসে নিশ্চিত ভাবেই রসগোল্লার রস মিশে থাকে। কিন্তু বঙ্গদেশেও রসগোল্লার আবির্ভাব কাহিনী নানা বিতর্কে মোড়া। ইতিহাস চুপচাপ রসে ডুব মেরেছে। কলকাতার সীতারাম ঘোষ স্ট্রীটের দীনু ময়রার পূর্বপুরুষ ব্রজ ময়রার দোকান ছিল হাই কোর্টের আশেপাশে। সেই দোকানেই ১৮৬৬ সাল থেকে মিলত রসগোল্লা। বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের ১৩১৩ সনের কার্য বিবরণীতে (পৃষ্ঠা – ১১১) উল্লেখ আছে – ক্ষিতীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ লুচি – তরকারি ‘ প্রবন্ধ অনুসারে কৃত্তিবাসের জন্মস্থান ফুলিয়াই রসগোল্লার জন্মস্থান। বেশ মজার গল্পও আছে এ নিয়ে। ফুলিয়ার হারাধন ময়রা রাণাঘাটের পালচৌধুরী মহাশয়ের মিষ্টান্ন প্রস্তুত করত। এমনই এক দিন হারাধন মন দিয়ে মিষ্টি বানাচ্ছে। উনুনে বসানো রসভরা হাড়ি। এমন সময়ে হারাধনের ছোট্ট মেয়ে সজোড়ে কান্না শুরু করলো। মিষ্টি বানানো মাথায় উঠলো হারাধনের। মেয়ের কান্না থামেই না। হারাধন ঠিক করলেন মেয়েকে নতুন রকম মিষ্টি খাইয়ে মন ভোলাবেন। উনুনে বসানো গরম রসে ফেললেন ছানার গোলক। খানিকক্ষণের মধ্যেই সেই গোলক ফুলে উঠল খানিক। মেয়ের কান্না সেই নতুন মিষ্টিতে থেমেছিল কিনা জানা নেই কিন্তু পালচৌধুরীরা সেই নতুন মিষ্টির ভক্ত বনে গেলেন। জমিদার বাড়ি থেকেই নামকরণ হলো – রসগোল্লা। এর সময়কাল আনুমানিক ১৮৪৬ -৪৭। 
কয়েক দশকের মধ্যেই কলকাতায় রসগোল্লা বিপ্লবের মহা শুরুয়াদ। ১৮৬৮ সালে নবীনচন্দ্র সেন প্রথম স্পঞ্জের রসগোল্লা তৈরি করেন। আজও বিখ্যাত কে সি দাসের রসগোল্লা। তো সেই কে সি দাসের পুরো নাম ছিল কৃষ্ণচন্দ্র দাস। তার পুত্র সারদাচরণ দাস গত শতকের তিরিশের দশকে বাগবাজারে রসগোল্লার কারখানা তৈরি করেন। রসগোল্লা তৈরিতে যন্ত্র যুগের শুরু। এখন যেমন রসগোল্লার নবতম অবতার বেকড রসগোল্লা। এর পাশাপাশি নাম করতেই হবে বর্ধমানের ভাতারের বিখ্যাত গোপালগোল্লার। সৃষ্টি এখানে তাঁর স্রষ্টা গোপাল ময়রার নাম নিজ মস্তকে ধারন করেছে। এই গোপালগোল্লা নাকি খেতে অনেকটা স্পঞ্জের রসগোল্লার মতো। 
এখন শহরের মিষ্টি সাম্রাজ্যের শাহেনশা রসোগোল্লাই।  আকর্ষণের কেন্দ্রতে আছে বেকড রসগোল্লা।  এই ব্যাপারে সিদ্ধহস্ত বলরাম মল্লিকের দোকান। আরো বেশ কয়েকটি দোকানে বেকড রসগোল্লা মেলে।  কে সি দাসের রসগোল্লা টিনের বাক্সে বিশ্ব জয় করছে। তবে আগেকার দিনে যেমন নেমন্তন্ন বাড়িতে অনেকে একসাথে ডজন ডজন রসগোল্লা মুখে পারতেন সেই রেওয়াজ এখন অনেক কমে গেছে। কিন্তু মেপে খাই  আর না খাই রসগোল্লা খাবই খাবো।  জয় জয় রসগোল্লা।  
তথ্য সহায়তা – 
বাঙালির খাদ্যকোষ – মিলন দত্ত 
বাংলার খাবার – প্রণব রায় 
টাইমস অফ ইন্ডিয়া – ই সংস্করণ 
চিত্রগ্রহণ –
সঙ্ঘমিত্রা নাগ 
রাহুল ঘোষ 
সুমন সরকার
অয়ন্তিকা মজুমদার 
 
 
Facebook Comments