শহরের ছেলে ছোকরা থেকে শুরু করে সব বয়সের মানুষেরই প্রিয় খাবারের অন্যতম বিরিয়ানি। শহর কলকাতা কিংবা কলকাতার আশেপাশের ছোট বড় মাঝারি নানারকম দোকানে বিরিয়ানির নানা রকমফের।হলুদ সাদা চাল , চিকেন কিংবা মটনের মন ভালো করা পিস্ , আর মস্ত আলুর টুকরো মিশিয়ে বাঙালীর এক এবং একমাত্র হার্ট থ্রব এখন বিরিয়ানিই। কিন্তু এই বিরিয়ানি এলো কথা থেকে ? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে খাদ্য গবেষকরা কিন্তু বেশ চিন্তায়। 
বিরিয়ানির আদি বাসস্থান পারস্য। খুব সম্ভবত চতুর্দশ শতকে বিরিয়ানি ভারতে এন্ট্রি নেয়। তখন কিন্তু বিরিয়ানিতে আলুর ব্যবহার ছিলো না। আসলে এদেশে তখন আলু মিলতই না। পর্তুগিজ শাসকদের হাত ধরেই এ দেশে আলুর আমদানি শুরু হয়। বিরিয়ানির চাল ও মাংসের মিশেলেই আচমকাই আমদানি আলুর । সে অবশ্য বেশ  খানিক পরের ঘটনা। ভারতে যখন বিরিয়ানি আসে তখন মুঘল আমল। মুঘল খাওয়া দাওয়া মাংস প্রধান। প্রথম দিকে কিন্তু বিরিয়ানি পোলাও কাবাবের প্রভাব কবলিত রাজসভায় প্রবেশের  অধিকারই  পায়নি। রাজসভা হচ্ছে অভিজাত জায়গা , সেখানে কাবাব চলে , পোলাও চলে , বিরিয়ানি নেভার। বিরিয়ানিকে একটু নিম্ন চোখেই দেখতেন পুরোদস্তুর নবাবী আভিজাত্যে মোড়া রাজপুরুষেরা।  নবাব , বাদশাহরা বিরিয়ানিকে সেই আভিজাত্যে নিতে একটু সময় নিয়েছিলেন। সেনা ছাউনিতে কিন্তু বিরিয়ানি সহজেই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। তখন হয়ত বিরিয়ানি বানানোর ক্রিয়া কৌশলও এখনকার মত জটিল হয়নি। সহজে কমপ্লিট লাঞ্চ সারতে বিরিয়ানি ছিল সেনা ছাউনির ফার্স্ট চয়েস। ক্রমে অবশ্য নামী রন্ধনকারদের হাত ধরে বিরিয়ানির স্বাদ বাড়তে থাকে। ক্রমে রাজসভাতেও বিরিয়ানি সমাদৃত হতে শুরু করে। একসময় নবাবেরাও দেশের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেন রাজনীতির নিয়ম মেনে । সেনাবাহিনীরও ট্রান্সফার হতো। ফলে সারা দেশ জুড়ে বিরিয়ানি তার সাম্রাজ্য বিস্তার করতে শুরু করে। বলাই বাহুল্য এর মাধ্যমে বিরিয়ানিতেও রেসিপি , মশলা , কালার এর পরিবর্তন শুরু হয়। 
এরপর পর্তুগাল থেকেও এলো পর্তুগিজ নাবিকের দল। তাদের প্রাথমিক উদ্দেশ্য ছিলো ব্যবসা বাণিজ্য। সেই সূত্রেই আলুর আমদানি শুরু হয় এ দেশে। এখন রোববার সকালে ফুলকো লুচি আর আলুর দম খেয়ে যতই দেশীয় ঢেকুর তুলি না কেন পর্তুগিজরা আসার আগে এ দেশে আলুর নাম গন্ধই ছিলো না। পর্তুগিজ নাবিকদের জাহাজ ভর্তি আলু এলো এ দেশে।  আলু এসেই টক করে ঢুকে পড়ল বিরিয়ানির হাড়িতে। কলকাতার অধিকাংশ বিরিয়ানির প্লেটেই আলুর বিরাট এক টুকরোর সাথে ডিম সেদ্ধ মেলে। বিরিয়ানির হাড়িতে হাঁস , মুরগীর ডিম কিন্তু ভারতের অন্য কোনও প্রান্তে মেলেনা। এ কলকাতার নিজস্ব ফুড হ্যাবিট। 
আবার ফিরে আসি সেই মুঘল আমলের দরবারী খানাপিনার খবরে। উনিশ শতকের শেষদিকে প্রকাশিত ‘ পুরনো লখনউ ‘বইয়ে আবদুল হলীম শরর কিন্তু লিখেছেন মূলত দিল্লীতেই বিরিয়ানির চল ছিল বেশি। লখনউ এর অভিজাত হালচালের সাথে পুলাও এর রমরমা। আইন – ই – আকবরি অবশ্য বিরিয়ানি ও পুলাও এর রন্ধন প্রণালীতে বিশেষ ফারাক করতে পারেনি। শরর কিন্তু লখনউ এর সূক্ষ্ম সৌন্দর্য্য প্রীতির মানসিকতার বিরিয়ানিকে ঘ্যাট বলতেও ছাড়েননি। 
এসব নবাবী বিতর্ক পেরিয়েও বিরিয়ানির স্বাদ ও গন্ধের বহু ভ্যারাইটি। বলা ভালো প্রতিদিন বিরিয়ানির নতুন ভ্যারাইটি জন্মও নিচ্ছে। আবার হারিয়েও যাচ্ছে কত ঐতিহ্য। ঢাকার বিরিয়ানিকে একসময় বলা হত দোগাসা। মোতাজান নামেও মিলত রঙিন , মিষ্টি এক আশ্চর্য বিরিয়ানি। মোতাজান এ ব্যবহৃত হতো ছাগল , ভেড়া বা দুম্বার গোশত। হায়দ্রাবাদের বিরিয়ানিও কিন্তু বেশ বিখ্যাত। নিজাম আমলে বিরিয়ানির সেই রূপকে বলে কাচ্চি বিরিয়ানি। কাচ্চি বিরিয়ানি মেলে ঢাকাতেও। কোথাও কোথাও স্থানীয় মশলা , স্থানীয় রন্ধন প্রণালী মিশে বিরিয়ানিকে আঞ্চলিক নিজস্বতা দিয়েছে। কেরল রাজ্যের সমুদ্র উপকূলে যেমন মেলে নারকেল দিয়ে রান্না করা মালাবারি  বিরিয়ানি। এছাড়াও ভারতের নানা প্রান্তে ভাটকালি বিরিয়ানি ( কর্ণাটক )  ,  মোরাদাবাদি বিরিয়ানি , থাল্লাপাক্কাট্টু বিরিয়ানি ( তামিলনাড়ু ) , ঢাকাই বিরিয়ানি মেলে। করাচির মেমনি বিরিয়ানিও খুব বিখ্যাত। 
বিরিয়ানির সাথে চিরকালীন ফাইট পোলাও এর। পোলাও এর আদি হিসেবেও আরবদেশ বা পারস্যের উল্লেখ আছে। কিন্তু সংস্কৃত সাহিত্যেও পলান্ন বা পল্লাও শব্দটি পাওয়া যায়। পোলাও আর বিরিয়ানির মূল ফারাক হল পোলাও তে ভাত , মাংস , সবজি , সব একসাথেই রান্না করা হয়। আর বিরিয়ানিতে চাল , মাংস , আলু সব আলাদা আলাদা করে কিছুটা রান্না করে বিরিয়ানির হাড়িতে পরতে পরতে সাজিয়ে একসাথে ফিনিশিং করা হয়। পোলাও অবশ্যই বিরিয়ানির থেকে অনেক পুরোনো। বিরিয়ানি অন্যদেশের থেকে এলেও এখন তারমধ্যে ভারতীয় তেল , মশলা।, রেসিপি মিশে সে একশো শতাংশ ভারতীয় রান্না হিসেবেই পৃথিবীতে স্বীকৃত।  বিরিয়ানিতে ব্যবহৃত ফুড কালার নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে তীব্র আপত্তি আছে। চালের রং হলুদ করতে কমদামী যে রং নাকি হরদম ব্যবহৃত হয় তা তীব্র ক্ষতিকারক। যদিও এইসব প্রচার খাদ্য ব্যবসায়ীদের সতর্ক করুক ইটা সবার চাওয়া। কিন্তু বিরিয়ানির পপুলারিটি তাতে বিন্দুমাত্র কমছে না। কলকাতার ফুড মার্কেটের ভোটে একই একশো বিরিয়ানি। ফার্স্ট ফুড থেকে আভিজাত্য। নিছক ছেলেছোকরা থেকে শুরু করে আঁতেল বাতেল , সকলেরই ফার্স্ট এবং লাস্ট চয়েস বিরিয়ানি। 
কলকাতা বিরিয়ানি 
মালাবার বিরিয়ানি 
মেমনি বিরিয়ানি 
কাচ্চি বিরিয়ানি 
লখনৌ বিরিয়ানি 
Facebook Comments