ছবি বানাতে ভাল লাগে। বিশেষ করে ডকুমেন্টারি বানাতে গিয়ে এত কিছু না চেয়েও পাওয়া যায়, যেটা হয়ত স্বপ্নেও ভাবা সম্ভব ছিল না। অবশ্য ভাবনাচিন্তায় সময়ের ফেরে অজান্তে ছবি ছলকে গেলে আর সেই বিশেষ মুহূর্তটা খুঁজে পাওয়াই মুশকিল হয়। আর এখানেই ডকু বানানোর আনন্দ। প্রতি মিনিটে আশ্চর্য হওয়ার মজা। ফিকশনের সাথে আমার আদৌ কোন বিরূপতা নেই। কিন্তু, বাঁধাধরা স্ক্রিপ্ট আর কাঁহাতক ভাল লাগে! রোজ ভাবনায় নতুন নতুন মোড় আসুক। সেটা মন্দ কিসের…
বেশ কয়েক মাস যাবৎ একটা ছবি করছি। চরিত্রগুলো তৈরি করতে হয় নি। কারন প্রথমত এটা ডকুমেন্টারি এবং দ্বিতীয়ত আমার ছবির চরিত্রগুলো রোজকার পর্দায় দেখা ক্লিশে চরিত্রদের থেকে একদমই আলাদা। এরা শাশুড়ি বা বউয়ের সাথে ঝগড়া করে না, গাছতলায় বসে প্রেম করে না, মায়ের আঁচলে ঘাপটি মেরে বসেও থাকে না, এবং ঘোরতর বিপদে না পড়লে ঘ্যানঘ্যানও করে না। এদের কাউকে কিছু বলে দিতে হয় নি, কিছু শেখাতে হয় নি; বরং এরাই কখন যেন আমাকেই আরও খানিকটা লড়াই করতে শিখিয়ে দিয়েছে। এদের মুখে জোর করেও প্রতিকূলতা, নেগেটিভিটি, হেরে যাওয়া, অসুস্থতা, হতাশ হওয়া ইত্যাদি কথা আপনি বসাতে পারবেন না। কারন এদের সামনে গেলেই আপনার অন্তরমহলে এদের মধ্যেকার পজিটিভ থাকার লড়াই, সমাজের ঘুণ ধরে থাকা ব্যারিকেডের জালগুলো ছিন্ন করে কিছু করে ফেলার তৃপ্তির হাসি দেখে নিজেরই নতুন করে ভাবতে ইচ্ছে করবে যে ভাল থাকতে হলে আসলে কিছুই লাগে না। শুধু নিজেকে কখনও হেরে যেতে দেখাকে ঘৃণা করতে শিখতে হয়। ব্যাস, এটুকুই।
আমার ছবিতে মেয়েরা ফুটবল খেলে রাজাবাজারের ভেতরে একটি কর্দমাক্ত ঘেরাটোপে। ধর্মে বেশিরভাগই মুসলিম। তবে এই ধর্ম নিয়ে আমার কিছু যায় আসে না। মেয়েরা প্রতিযোগিতামূলক ফুটবল খেলছে। রাজাবাজার এলাকায় কিছু অসমসাহসি মেয়ে দাপিয়ে ফুটবল খেলছে। এটাই বা কম কি?
প্রায় সবাই একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার সঙ্গে যুক্ত। সেখান থেকেই জোগান আসে ফুটবল, জুতো, জার্সি… এমনকি দুজন প্রশিক্ষকও। আমি এবং জয়ন্ত প্রায় মাস ছয়েক যাবৎ এদের নিয়ে কাজ করছি। বলা ভুল হল। বরং এদের থেকে শিখে চলেছি। আশ্চর্য সব অভিজ্ঞতা হচ্ছে ছবি তুলতে গিয়ে। কখনও খুব ভোরে বা কখনও বেশ রাতে এদের প্র্যাকটিস করার সুযোগ মেলে। গত সপ্তাহেই বৃষ্টির মধ্যে সাউন্ড রেকর্ডিং করতে ভুলে গেলাম। শুধু ছবি এল ক্যামেরায়। মন খারাপ থাকল বেশ কয়েক দিন। সেটা কাটিয়েও উঠলাম। ছোট থেকে বড় সবার সঙ্গেই কথা বলছি, বলেই চলেছি। বন্ধুত্ব হয়ে গেছে সবার সঙ্গে। সবার বাড়ি বাড়ি গিয়ে চা খেতে খেতে গল্পের ছলেই অন্য একটা দরজা খুলে গেছে আমাদের সামনে। প্রত্যেক মানুষ তার মত অন্যরকম। কিন্তু কয়েক মাস যাতায়াত করতে করতে ঠিক যখন আমি বুঝতে পারলাম যে আমাদের মধ্যে একটা অদৃশ্য মেলবন্ধন হয়ে গেছে; তখনই নিশ্চিত হলাম যে আমাদের এই ছবিটা হবেই এবং ভালই হবে। আগের ছবিটা করতে গিয়ে যত প্রতিকূলতা ছিল, এখানেও সেটার অভাব নেই। আমার কাছে লোকবল নেই, কোন ফান্ডিং এর বালাই নেই, যথেষ্ট যন্ত্রপাতি নেই। ভরসা বলতে আমি নিজে। আর সুহৃদ রিসার্চ স্কলার জয়ন্ত। ওই আমাকে খবরটা দিয়েছিল এই ব্যাপারে। রিসার্চের প্রাথমিক কাজটা ও আমার থেকে হাজারগুণ ভাল করে। এবারো সেটাই হয়েছিল। একটা ফোনকল ও একটা মাত্র ইন্টারনেট নিউজ দেখেই ও বুঝতে পেরেছিল যে এটার থেকে ছবি হতে পারে। একে আমার প্রিয় ফুটবল, তার ওপর এতরকম দৃষ্টিকোণ। ঝাঁপিয়ে পড়ার সেই শুরু। সমস্তরকম কাজে প্রোজেক্টের কর্ণধার সাইনা জাভেদের সাহায্য পাচ্ছি। কাজ এগোচ্ছে তুমুল উৎসাহে। তবে এটা আমি খুব ভাল করে জানি যে, ক্যামেরাসহ সব মালপত্র ঘাড়ে নিয়ে 79D বাসে চেপে নিয়মিত যাওয়াতে কোন কামাই আগামী কয়েকদিন হবে না।
যাই হোক। এই ছবিটা শেষ হলে আরও ভাল করে বলা যাবে না হয়। এবারকার গল্পটা হল কয়েকদিন আগের কিছু কাজকম্ম নিয়ে। একখানা ছোট তথ্যচিত্র করেছিলাম। নাম দিয়েছিল জয়ন্ত । CHILDREN OF SOIL. ছবি তুলেছিলাম আমি আর জয়ন্ত, বানিয়েছিলাম আমি। এই ছোট ছবিটা এখন পর্যন্ত দেশে গোটাতিনেক এবং ভারতের বাইরে মোট দশটা ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে অফিসিয়ালি সিলেক্টেড হয়েছে এবং আর্জেন্টিনার ইন্টারন্যাশনাল লেবার ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে আন্তর্জাতিক তথ্যচিত্র বিভাগে দ্বিতীয় হয়েছে। এতটা আমি আশাই করি নি। আবার জানতাম যে ছবিটা ঠিকমত বড় স্কেলে বানাতে পারলে হয়ত বেশ কিছু খরচ করে বড় বড় ফেস্টিভ্যালে পাঠাবার ঝুঁকি নেওয়া যেত। এই জিরো বাজেটের ছবিটা বানানো সম্ভবই হত না যদি আমার বন্ধুরা সবাই মিলে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিত। যেটুকু সম্মান, তার সবটাই সবার জন্য। হয় না… এসব সুন্দর মানুষ ছাড়া নিজের ছবি হয় না।
যা বলছি এগুলো অবান্তর কিনা জানি না। তবে এভাবে লেখার থেকে কলমের খোঁচায় সমালোচনা করতেই আমি অভ্যস্ত। তাহলে এটাকে স্বয়ং-ব্যবচ্ছেদই বলা যাক।
ছবিটা করার শুরু ইউনিভার্সিটি থাকার সময়। সেটা নেহাতই প্রয়োজনের তাগিদে বা সরাসরি নম্বর পাওয়ার জন্য করতে হয়েছিল। আমাদের মানে আমার, জয়ন্ত আর মিঠুর পছন্দ হয়েছিল আশেপাশের ইটভাঁটাগুলো। ইট তৈরি নিয়ে কিছু একটা করে দিলে কেমন হয়? লেগে পরা গেল। ডকু আমি আগেও করেছি। তাই এটা নতুন কিছু না। ভাবলাম বেশ ছবি উঠবে। ইটের রঙে আলোটালো খেলবে। নম্বর পেয়ে যাব। আমরা সবাই মিলে অভিযান চালালাম আশেপাশের ইটভাঁটাগুলোতে। আমরা মানে মূলত আমি আর জয়ন্ত। মাঝে মাঝে মিঠু ও দেবাশিষ। ভরসা একটাই যে ইউনিভার্সিটি প্রফেশনাল ক্যামেরা ভাড়া করে দেবে। সেটা আমরা পেয়েছিলাম। কিন্তু খুব কম সময়ের জন্য। তাই যেটা বানিয়েছিলাম, সেটাও হয়েছিলো তথৈবচ। ভাইভা তে জয়ন্তকে গৌতম স্যারের গালাগাল খেতে হল।(যদিও আমি আমার ফিকশন শর্ট ফিল্মটায় আরও অনেক বেশি গালাগাল খেয়েছিলাম)। তিরস্কার, কম নম্বর, মজা… সবই হল। কিন্তু একটা জিনিস মাথার ভেতরে থেকে গেল… কতগুলো অপার্থিব নিষ্পাপ মুখ। যখনই ঘুমোচ্ছি, ভাবছি, বাসে, ট্রেনে একলা বসছি… সেই ইটভাটার বাচ্চাগুলোর মুখ মস্তিস্ক থেকে কিছুতেই যাচ্ছে না। শিশু থেকে বড় হওয়ার পথে শৈশবের এই নীরব অপমানের বিরুদ্ধে কেউ কিছু বলছে না কেন? ইউটিউব ঘেঁটেও প্রায় কিসসু পাওয়া গেল না।
মনে হল… বেঁচেই আছি যখন, নিজের মানে ক্যামেরার ভাষায় কিছু বলতে পারলে ক্ষতি কি! আমি তো সামান্য ফিল্মমেকার। তবুও যেটুকু বলা যায় তার দাম কি সভ্য মানুষ দেবে না? কোন যশ, লোভ ইত্যাদির দায় নেই। কারন, আমার ছবি শেষ পর্যন্ত আমিই প্রযোজনা করেছি। সেখানে কোন মিথ্যে নেই। কিন্তু কতগুলো নিষ্পাপ মুখ আছে যারা সারাদিন আমার স্বপ্নে জাগরণে ইংরেজি ভাষায় যাকে বলে “হনট” করে বেড়ায়। ঠিক করলাম যে এই ভাবনাগুলোকে বাস্তবে মানুষের সামনে তুলে ধরতে হবে। হারতে রাজি নই। কোনদিন রাজি ছিলামও না।
কিন্তু বাধা হয়ে দাঁড়ালো টাকাপয়সা। কারন ডকু ছবি সে যত ভাল বিষয়েরই হোক। সেটার জন্য টাকা যোগানোর কাউকে পাওয়া যায় না। অন্তত আমাদের দেশে। মিডিয়াও এক মাসে বানানো রদ্দি ছবির জন্য যে পরিমাণ নিউজপ্রিন্ট আর মেমোরি কার্ড খরচ করে তার ইওত্তা নেই। কিন্তু কয়েক বছর ধরে নিজেকে মাঠে ঘাটে বিলিয়ে দিয়ে সত্যির জীবন যারা তুলে আনেন তাদের ক্ষেত্রে হয়ত মনে হয় যে এই খবরটা পাব্লিক খাবে না। এক্ষেত্রে সম্ভবত সিনেমা সম্পর্কিত অশিক্ষাই দায়ী। তবে ডকুমেন্টারির সততা সবজায়গায় খুঁজতে যাওয়াটা বোকামোও। শিক্ষিত মানুষ প্রচুর আছেন আমাদের আশেপাশে, তবে নিরপেক্ষ সত্যির ওপর লগ্নি করার মত মানুষ পাওয়া দুষ্কর। যাই হোক টাকা পয়সার অভাবে কাজটা বড্ড ঢিমেতালে চলতে লাগল। আমরা বারবার গেছি। ঝুপড়ির মধ্যে মানুষের সাথে কথা বলতে বলতে সারাদিন কেটে গেছে, কিন্তু ছবি তোলার ক্যামেরা না থাকায় অনেক ফুটেজ পাই নি। মাঝে মাঝে এদিক ওদিক থেকে ক্যামেরা জোগাড় হতেই ফের ছুটে গেছি। যা পেয়েছি সেগুলোই বারবার দেখে প্রায় মুখস্ত হওয়ার মত। মাঝে একজন কলেজ ছাত্রীর বরাত পেয়ে ওই ইট তৈরি নিয়ে শর্ট ফিল্ম বানাতে গেলাম। কথা ছিল যে সেই ফুটেজটা আমরা পাব। ক্যামেরা করে দেওয়ার জন্য কোন পয়সা নেব না। কোথায় কি? সেই ফুটেজও জুটল না। আবার সেই একই অবস্থা। মাঝে কয়েকবার ক্যামেরা ভাড়া এবং ম্যানেজ করে আমি আর জয়ন্ত ছবি তুলে নিয়ে এসেছি। ভাল রেকর্ডার না থাকায় ইন্টার্ভিউগুলো স্পষ্ট আসে নি। তাই ব্যবহারও করা হয় নি।
বছর দেড়েক হল আমার মা আমাকে একখানা বেশ ভাল ডিএসএলআর ক্যামেরা উপহার দিলেন। বন্ধু শিবু সৌদি আরব থেকে খানিক কম পয়সায় সেটা এনে দিল। ক্যামেরা হল, ল্যাপটপ জোগাড় হল, একখানা “রোডে”র প্রফেশনাল মাইকও কেনা হল। সঙ্গে স্ট্যান্ড, কিছু আলো। ব্যাস, এবার হিসেব শেষ করার পালা। ক্যামেরাটা খানিকটা বশে এনে বাকি যেটুকু মনে হল সেটুকু তুলে ফেললাম। আমার মতে যেটুকু রাশ জোগাড় হয়েছিল তাতে একটা বেশ বড় ডকু নামিয়ে ফেলা যেত। কিন্তু আবার মনে হল যে যদি ছোটর মধ্যে যদি সব বলে দেওয়া যায়, তাহলে ব্যাপারটা অনেক বেশি কম্প্যাক্ট হতে পারে। অনেক ভেবেটেবে একটা ধাঁচে ভাবনাগুলোকে সাজানো গেল। বেশ কয়েকদিন ঘর থেকে না বেরিয়ে এই সংক্রান্ত যত তথ্য, প্রবন্ধ ইত্যাদি জোগাড় করেছিলাম এতদিন ধরে, সেগুলোকে আত্মস্থ করলাম। হাত পড়ল বিষম জটিল সংবিধানের ধারাগুলিতে। সেখান থেকেও আমার বক্তব্যের সাপোর্টে অনেক কিছুই মিলল। উৎসাহ পেলাম।
এবার সব কাগজপত্র ডিজিটাল করে উত্তরবঙ্গের গয়েরকাটায় আমার বাড়িতে গেলাম। সেখানে অশেষ শান্তি। নিজে রান্না করার ঝামেলা নেই, বিভিন্ন রকম দূষণের উপদ্রব নেই। রাফ কাটের ওপর একটা ভয়েস ওভার দাঁড় করালাম। আমি সবকিছুই বাংলায় ভাবতে পারি, ইংরেজিতে ভাবার দক্ষতা আমার নেই। আমার তৎকালীন ছাত্রী বাংলা ভাষায় দক্ষ সুকন্যাকে দিয়ে সেটার গ্র্যামারগত ভুলগুলো শুধরে নিলাম। তারপর করলাম স্ক্রিপ্টের অনুবাদ। নিজের করা ইংরেজি অনুবাদটা মোটেও মনপুত হল না। জয়ন্তকে কলকাতায় সেটা পাঠালাম। ওও সময় বের করতে পারল না। এযাত্রায় উৎরে দিল অভিরুপাদি। সৌরভদাদের অফিসে একবার গিয়ে বলতেই অসীম যত্ন আর সময় নিয়ে সম্পূর্ণটা ভাল ইংরেজিতে অনুবাদ করে দিল। সেটাকে মোবাইলে ডামি রেকর্ড করে প্রায় ফাইনাল কাটটা পর্যন্ত এনে ফেলা গেল। কিন্তু আসল রেকর্ডিংটা যে ভীষণ দরকার। এসব ক্ষেত্রে সায়ক সবসময় ভীষণ পজিটিভ। প্রচুর কাজ নিয়ে থাকে। কিন্তু এই রেকর্ডিংটা মাত্র দুদিনে আমার মেলে পৌঁছে গেল। আমাদের দীর্ঘদিনের একসাথে কাজ করার অভিজ্ঞতা আর বন্ধুত্ব কাজগুলোতে পজিটিভ অনুঘটকের কাজ করে। অবশ্য মাঝের জেগে থাকা ৪৮ ঘণ্টায় স্ক্রিপ্টে বেশ কিছু পরিবর্তন হল। সায়ক নিজের মত করে বেশ কিছু শব্দ সাজিয়ে নিল এবং আমার পাঠানো নতুন কিছু লাইন নিজেই অনুবাদ করে যোগ করে দিল। মিলিয়ে মিলিয়ে বলার জন্য রাফ ভিডিওটাও ওকে কম রিজল্যুশনে পাঠিয়ে দিয়েছিলাম।
এতদিনে আমি মোদ্দা একটা কথা শিখেছি যে যদি ডকু ছবির পরিচালক হতে হয় তাহলে সব কিছুতেই যথেচ্ছ টেকনিক্যাল জ্ঞান থাকতেই হবে। তার সঙ্গে বিষয়ের সঙ্গে সম্পূর্ণ ডুবে থেকে ছবিগুলো জিগ স পাজলের মত মাথায় বারবার ওলট পালট করতে হবে। বারবার ফুটেজ দেখতে হবে। সে যতই বোরিং লাগুক না কেন। স্ক্রিপ্টের নানা অদল বদল নিয়ে রোজ সকাল বিকেল বসতেই হবে। কিভাবে গল্পটা বলতে হবে সেটা নিয়ে স্পষ্ট ধারনা করার ক্ষমতা না থাকলে পরিচালক হওয়ার দুরাশা না করাই ভাল। তবে একটাই ভাল ব্যাপার। ক্যামেরা, এডিটিং আর সাউনড আমি নিজেই করতে পারি। এটা মস্ত সুবিধে। কাজ চালানোর মত হলেও খরচ শুধু কয়েকটা মাথার চুল। যেগুলো ভাবতে ভাবতে ওঠার উপক্রম হয়। তাছাড়া জয়ন্ত আছে। ওর জ্ঞ্যান এবং রিসার্চের জুরি মেলা ভার। পরিচালনার ক্ষেত্রে ওর থেকে অনেক মুল্যবান উপদেশ পাওয়া যায়।
মোটামুটি ফাইনাল কাট তৈরি হল। কয়েকজন পরিচিত মানুষকে দেখিয়ে নিলাম। যারা অন্তত খারাপ ভাল নিয়ে নিরপেক্ষ থাকবেন। তাদের কথা শুনে নিশ্চিন্ত লাগল খানিকটা।
সাবটাইটেল করার সময় আবার মাথায় হাত পড়ল। এবার ফোন করলাম অধ্যাপিকা চৈতালিদিকে। তিনি স্প্যানিশ ভালই জানেন। চৈতালিদি যোগাযোগ করিয়ে দিলেন ডক্টর দিব্যজ্যোতি মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে। তিনি কলকাতার অন্যতম সেরা স্প্যানিশ ভাষা বিশারদ। ভয়ে ভয়ে ফোন করলাম। আর করে অবাক হলাম। স্বল্পভাষী মানুষটি আমার প্রয়োজন শুনেই ফাইল পাঠিয়ে দিতে বললেন। এভাবে সাহায্য পাব ভাবতেই পারি নি। বেশ কিছুদিন বাদে হলেও নিখুঁত স্প্যানিশে অনুবাদিত আমার স্ক্রিপ্ট এসে ইনবক্সে উপস্থিত হল। পড়ে বুঝতে না পারলেও জানতাম যে আমার ভয়েস ওভারের স্প্যানিশ অনুবাদ এর থেকে সুন্দর আর কিছু হতে পারত না। ইংরেজি সাবটাইটেল আগেই তৈরি করেছিলাম। এবার স্প্যানিশ বানিয়ে ফেললাম। গুগলের সাহায্যে জার্মান অনুবাদ করে জয়ন্তর কাছে পাঠালাম সংশোধন করতে। ও সেটা করে পাঠিয়ে দিল। জার্মান ভাষায় কাজ চালানোর মত একটা সাবটাইটেল পাওয়া গেল। কিন্তু টাকার অভাবে বাদ থেকে গেল ফরাসি, ইতালিয় এবং সঠিক জার্মান অনুবাদ। সেগুলো করতে পারলে আমি নিশ্চিত যে আরও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ফেস্টিভালে ছবিটি পাঠাতে পারতাম এবং প্রাইজ পেত। হয় নি, সেটা আলাদা কথা। যা আছে সেটাই বেশ কিছু ফ্রি ফেস্টিভ্যালে পাঠালাম। কোন এন্ট্রিফিওয়ালা ফেস্টিভ্যালে পাঠানোর সামর্থ্য আমার ছিল না। আক্ষেপ থাকলেও এক্ষেত্রে উপায় নেই। তারপর একটা দুর্ঘটনা ঘটল।
এডিট করা ছবিটি সহ আমার বহু কষ্টে জোগাড় করা এডিটিং ল্যাপটপটি চুরি গেল(সুধী পাঠক, ল্যাপটপ চুরি নিয়ে গোরাবাজার থানা এবং লালবাজারের পুলিশের অপদার্থতা নিয়ে আরও একটি মজার লেখা এর মধ্যেই প্রকাশ পাবে। নাম প্রকাশ পেলেও সত্যি ঘটনা কুশীলবদের ছাড়া সবাইকে আনন্দ দেবে)। ল্যাপটপের সাথে খোয়া গেল আমার এডিট করা ছবিটিও। ভাগ্যিস একটা ভার্সন ইতিমধ্যে ভিমিও এবং ফেস্টিভ্যাল প্ল্যাটফর্মে আপলোড করে ফেলেছিলাম। সেই সুত্রেই একের পর এক ফেস্টিভ্যালে ছবিটি নির্বাচিত হতে লাগল। মাঝে মাঝে গর্ব হয় নি সেটা বললে মিথ্যে বলা হবে। কিন্তু আপাতত সেই অধ্যায় প্রায় শেষ করতে চাই। কোন কিছুতে আটকে থাকায় একটা স্থবিরতা আছে। আজকে বিভিন্ন মিডিয়াতে রাজাবাজারের লড়াকু মেয়েদের ফুটবল খেলা নিয়ে লেখা দেখে আনন্দ হচ্ছে। আনন্দ হচ্ছে যে সবাই আমাদের মত করে ভাবছে, ভাবতে পারছে। কিন্তু সেই সঙ্গে দুঃখ হয় যে ইট ভাঁটার সেই আশ্চর্য সরল কচি মুখগুলো নিয়ে আমাদের মিডিয়ার কোন মাথাব্যাথা নেই। কে জানে এটাও পাব্লিক খায় না বলে কিনা!

 

চিত্রগ্রহণ – জয়ন্ত বসু 

Facebook Comments