যে ভয়ঙ্কর সময়ে দাঁড়িয়ে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদের কণ্ঠস্বরেও লাগাম পড়াতে চায় ক্ষমতার কণ্ঠস্বর সেই সময় সত্যিই এক ভয়ঙ্কর নিষিদ্ধতার সংশয়ে ভোগে। সেই সময়েই নাটক ‘ নিষিদ্ধ সময়ের বর্ণমালা ‘। পার্থ মুখোপাধ্যায়ের এই নাটকের সম্পাদনা ও নির্দেশনায় অশোক ঘোষ। হাওড়া কদমতলা থিয়েটার ওয়ার্কার্সের এই নাটক শুরু হয় যখন লেখক শশাঙ্কশেখর সান্যালের উপন্যাস সময়ের বর্ণমালা নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে সরকার। লেখকের সাক্ষাৎকার  নিতে হাজির সাংবাদিকরা। তাদের প্রশ্নের উত্তরে শশাঙ্ক ফিরে তাকাচ্ছেন তার উপন্যাসে যা তারই জীবনের অধ্যায়। 
শশাঙ্কশেখরের লেখার মধ্যে যে সম্প্রীতি ভাবনা , ধর্মীয় মিলনবোধ , সিন্ডিকেটেড ধর্মের বিরুদ্ধে জেহাদ তা তাঁর পুঁথিগত ভাবনার নয় , তাঁর জীবনবোধজাত। পূর্ববঙ্গের কলমকাঠির দাঙ্গায় সে তার মা , দিদিকে হারিয়েছে। হারিয়েছে জীবনের অমূল্য অধ্যায়। আবার অন্যধর্মের মামুন তাকে দিয়েছে ডরহীন আশ্রয় , প্রশ্রয় এবং বেড়ে উঠবার রসদ। সবথেকে বড় কথা এই অধ্যায়েই শশাঙ্কশেখরকে দিয়েছে জীবনের মূল্যবান শিক্ষা – মুক্তচিন্তার শিক্ষা , মানবতার শিক্ষা। সিন্ডিকেটেড বা সংগঠিত ধর্মের মুখোশ চিনতে পেরেছেন শশাঙ্ক। উপন্যাসের প্রেক্ষাপট কিন্তু পূর্ববঙ্গের স্বাধীনতা পূর্ববর্তী দাঙ্গার সময় নয় বরং এমন একটা সময় যখন ফৈজাবাদে দাঙ্গার আগুন ধিকধিক জ্বলছে। ফৈজাবাদেই থাকে মামুন। আর মামুন দাঙ্গার বিষবাস্প এড়াতে নিজের মেয়েকে পাঠায় কলকাতায় শশাঙ্কের কাছে। মামুনের মেয়ে পায়েলকে ভিনধর্মী বলে পরিবারে মেনে নিতে চান না শশাঙ্কের স্ত্রী সুনন্দা। শশাঙ্কের ছেলে শুভ এই নাটকের আরও একটা ভিন্ন শেড তৈরি করেছে। শুভ এই সময়ের উদ্দাম যুবক। বাবা খ্যাতিমান লেখক , জ্যেঠা স্বাধীনতা সংগ্রামী। এই ঐতিহ্যকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে শুভ পাড়ার মাস্তান। কথাবার্তায় দুর্বিনীত , উদ্দাম , উশৃঙ্খল। শুভ ধীরে ধীরে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে পায়েলের সাথে। মুক্তচিন্তার দমকা হাওয়ায় মজে যায় যুগ যুগান্তের বস্তাপঁচা ধর্মের পাঁচিল। অনবদ্য লাগে শুভ ও পায়েলের গলায় – আমার মুক্তি আলোয় আলোয় – এই আকাশে। নাটকের স্বাভাবিক দ্বন্দ্ব মেনে এই সম্পর্কের বিপরীতে দাঁড়িয়ে যান সুনন্দা। শুভ ও পায়েলের সম্পর্কের পাখনা মেলার আগেই নাটক তার ক্লাইম্যাক্সে পৌঁছয়। 
এ নাটক ভীষণভাবে সমসাময়িক।  একদিকে ধর্মীয় মৌলবাদের  বিরুদ্ধে স্পষ্ট স্টেটমেন্ট , পাশাপাশি শিল্পের স্বাধীনতার সপক্ষে দৃঢ় ঘোষণা। স্পর্ধিত উচ্চারণে এ নাটক ক্ষমতার চোখে চোখ রাখে। মৌলবাদের বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করে। নাট্য রূপায়নে নির্দেশক ভীষণভাবেই আধুনিক ও পরিমিত। নাটকের দাবি মেনে নৃত্য এসেছে মঞ্চে , এসেছে অডিও ভিসুয়াল। আলো ও মঞ্চসজ্জা যথাযথ। চরিত্রচিত্রণে শশাঙ্কশেখর , সুনন্দা ও মামুনের ভূমিকায় শৌভিক মজুমদার , সুমনা চক্রবর্তী ও শেখর বন্দ্যোপাধ্যায় ভীষণ ভাবেই বাস্তব। নাটকীয় বাহুল্য ত্যাগ করে একদম রক্ত মাংসের চরিত্রে পরিণত হয়েছেন। শশাঙ্কশেখরের স্বাধীনতা সংগ্রামী দাদার চরিত্রে সত্যপ্রিয় সরকার অসম্ভব বলিষ্ঠ অভিনেতা। শুভর ভূমিকায় গম্ভীরা আর পায়েলের ভূমিকায় মৌসুমি মঞ্চে বিদ্যুৎ ঝলকের মত। অসম্ভব প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন দুজনেই। নির্দেশক অশোক ঘোষের ভাবনাকে কুর্নীশ জানাতেই হয়। 
চিত্রগ্রাহক : শুভশ্রী দাস 
Facebook Comments