পালকির কথা শুনলেই কানে বেজে ওঠে হেমন্ত মুখার্জীর গলায় সত্যেন দত্তের সেই বিখ্যাত পালকির ছড়া। শরীরে মনে এক আশ্চর্য দুলুনি এনে দিত সেই পালকির গান। এই গান অনেকেরই চেনা। তবে সত্যেন দত্তের কবিতায় যে পালকি যাত্রার কথা বলা হয়েছে তা মূলত গ্রামের রাস্তায়। পুরোনো কলকাতায় একসময় যানবাহনের অন্যতম মাধ্যম ছিলো পালকি। না গল্পে কবিতায় নানাভাবে চিত্রিত হয়ে আছে কলকাতার পালকি যাত্রা এবং তার থেকেও ইন্টারেস্টিং সত্যিকারের পাল্কিবাহকদের দ্বারা গাওয়া পালকির গান। 
লোলা মন্টেজ ছিলেন এক বিখ্যাত সুন্দরী। ঊনবিংশ শতাব্দীর সময়কাল।  প্রথম জীবনে বিখ্যাত নাচিয়ে লোলা পরবর্তী কালে এক ইংরেজ সৈনিককে বিয়ে করেন।  সেই সূত্রে তার কলকাতায় আসা। কলকাতায় বেশিদিন থাকেননি তিনি। কারন বিয়ে কিছু বাদেই তার স্বামী অন্য নারীতে আসক্ত হয়েছিলেন।লোলার লেখালিখির অভ্যেস ছিলো। লিখতেন কলকাতার নানা অভিজ্ঞতার কথা।  পালকি তার মোটেও খুব পছন্দের যান ছিল না।  কিন্তু পাল্কিওয়ালাদের ছোড়া তাকে মজা দিতো বলে মনে হয়। পালকি বাহকেরা পালকি চালাবার পরিশ্রম কম করতে নানা ছোড়া , গান এসব করে মজা মস্করা করতেন।  অনেক সময়েই এই পালকিতে যারা চাপতো তারা দেশীয় ভাষা জানতো না। সেই সুযোগে পালকিতে চেপে বসা মানুষটিকে নিয়ে মজা মস্করার গান ও তৈরী হতো মুখে মুখে।  তেমনই এক গল্প শুনিয়েছেন লোলা মন্টেজ। একবার এক বিরাট মোটা ইংরেজ পাদ্রী পালকি চেপেছেন।  বোঝাই যায় তাকে বহন করতে বাহকদের নাজেহাল দশা। তারা গান ধরলো –
উঃ কি ভারী মাল রে বাবা 
নাঃ ! ইটা একটা হাতি 
উঃ ! এর কি ভীষণ ওজন 
এসো  এটাকে আমরা নাবিয়ে দি !
এসো এটাকে আমরা দিই কাদায় ফেলে –
তারপর ওর যা হবে হোক। 
কিন্তু ভাইরে , তাহলে বেটা 
ওর মোটা লাঠি দিয়ে আমাদের ঠ্যাঙাবে। 
তাই জলদি করে চলা যাক 
লাফিয়ে চলো চটপট। 
– ভাগ্যিস পাদ্রী বাংলা বুঝতেন না। লোলা মন্টেজ পালকি চেপে নিজেকে নিয়ে গান শুনেও ভারী মজা পেয়েছিলেন। 
ইনি  মোটেই ভারী নয় 
কাব্বাডা  ( খবরদার )
ছোট বাবা মিশি 
কাব্বাডা 
চটপট নিয়ে চল 
কাব্বাডা 
মিশি বাবা 
কাব্বাডা। 
এই ভাষা দেখে পন্ডিতেরা আন্দাজ করেছেন এরা খুব সম্ভবত  রাওয়ানি সম্প্রদায়ের পালকি বাহক। যারা কলকাতায় এসেছিলেন দেশের পশ্চিম দিক থেকে। কলকাতার আদি পালকি বাহকেরা সবাই ছিলেন ওড়িশার ভদ্রক অঞ্চলের। ১৮২৮ সালে ময়দানে মস্ত সভা ডেকেছিলেন ওড়িশার পালকি বাহকেরা। ভাড়া বাড়ানো সহ নিজেদের দাবি দাওয়া নিয়ে বিরাট আন্দোলন। শেষমেশ দাবি না মেটায় নতুন পালকি বাহক আনা হয় দেশের পশ্চিম প্রান্ত থেকে।  তবে পরবর্তী কালের কলকাতায় দু রকমের পালকি বাহকেরই দেখা মিলতো।  ের সবাই ধীরে ধীরে বাংলায় থাকতে থাকতে বাংলা শিখে নিয়েছিল।  কিন্তু স্বাভাবিক ভাবেই এদের ভাষার মধ্যে নিজেদের দেশীয় ভাষার শব্দ এসে পড়তো।  তাই সত্যিকারের পালকি বাহকদের গানে দেশীয় ভাষা আছে। 
ক্ষিতীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর কলকাতার চলাফেরা বইতে পালকির কথা বলেছেন বেশ কয়েকবার। বিষ শতকের গোড়াতেও কলকাতায় অনেক পালকি ছিলো।  জোড়াসাঁকোতেই ছিল চার পাঁচটা পালকির আড্ডা ( এখনকার ভাষায় জেক বলে স্ট্যান্ড ) ছিলো।  একসময় কতৃপক্ষের এদেশে ছোটরা পালকি করে নর্মাল স্কুলে যেতো। পালকির বেহারাদের মজাদার সুর ছিল – ধ্যাককুনাবর হেইয়া নাবর। এই সুর ছোটদের এতো প্রিয় ছিল যে স্কুল যাবার পথে ছোটরাও বাহকদের সাথে গলা মেলাতো। 
আর একটা মজার গল্প দিয়ে শেষ করবো। বিপিনবিহারী গুপ্ত প্রেসিডেন্সি কলেজের গণিত বিভাগের অধ্যাপক ছিলেন। ১৮৮৩ থেকে ১৯০১ অবধি তিনি এক কলেজে পড়াতেন। দারুন করা ধাঁচের মানুষ। ছাত্ররা খুব ভয় পেত তাকে। রোক পালকি করে কলেজে আসতেন বিপিনবাবু।  আর আসার পথে পাল্কি বাহকেরাও গান জুড়তো।  সেই গানের এমন মাহাত্ম যে বহু দূর থেকে সেই সুর শুনে কলেজের হৈ  চৈ থেমে অংক স্যারের ভয়ে কাঠ হয়ে যেত প্রেসিডেন্সি কলেজ। 
Facebook Comments