জানলার বাইরে ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টি। মন ভেজাচ্ছে গিন্নির আদুরে চাউনি। মনের আনাচ কানাচে উচাটন। ইলিশের গন্ধ ভেসে আসে নাকে।  গরম ভাত। ধোঁয়া  উড়ছে। সাথে একটু ইলিশ মাছের তেল , একটু নুন আর লঙ্কা। একটা মন কেমন ছুটির দিন। ইলিশ মাছের এই সুদিন কিন্তু আজকের নয়। জীমূতবাহন ছিলেন বহু যুগ আগের এক শাস্ত্রকার।  ভেষজ ও প্রাণীজ তেল নিয়ে বলতে গিয়ে পরমানন্দে ইলিশ সুন্দরীর নাম করেছেন। মাছের রানী।  হৃদয় হরণ করেন অনায়াসে। রূপকথার মৎস কন্যা যেনো , সমুদ্রের অতল গভীর থেকে যে সর্বনাশের নেশায় ঢুকে পরে হৃদয়ের অলকানন্দা জলে। নদী নালা পেরিয়ে নাকি সে পারি জমাতে পারে বারোশো কিলোমিটার।  সভ্যতার বিস্তারে ফারাক্কায় ব্যারেজ হয়েছে। গঙ্গার ইলিশ তাই আটকে যায় সেখানেই।  আগে নাকি ইলিশ মিলতএলাহাবাদের গাঙ্গেয় উপত্যকাতেও। বংশীধারীর মোহন বাঁশির শুরে নাকি একসময় আগ্রা পারি দিত যমুনার ইলিশ। সমুদ্রেও আজকাল অনেকেই ইলিশ ধরেন।  কিন্তু ইলিশের আসল স্বাদ নদীর ইলিশে। ডিম্ পাড়তে যদি পথে গভীরে ঢুকতে থাকে ইলিশ। স্বাদে গন্ধে ততই অতুলনীয়া হয়ে ওঠে সে।
 
বঙ্গজীবনে ইলিশ মঙ্গলের বার্তাবহ।  আগেকার দিনে রসে  বশে , অম্বলে জড়িয়ে থাকা বঙ্গ  জীবনে সরস্বতী পুজোর দিন সাড়ম্বরে ইলিশ সুন্দরীর আগমনী ঘটতো।  জোড়া ইলিশ রীতিমত সিঁদুর আলতায় সাজিয়ে ঘরে তুলতেন বধূরা। রসনার আল্হাদ তো ছিলই , সাথে ছিল চির দুঃখী বাঙালির সুখ স্বাচ্ছন্দের প্রত্যাশা। বসন্ত পেরিয়ে , গ্রীষ্ম পেরিয়ে বর্ষা আসতো।  আল্হাদিনীর সেই তো আসল আল্হাদের সময়। ঘরে ঘরে ইলিশের সুস্বাদ। কখনো ইলিশ ভাঁপা , কখনো স্রেফ ইলিশের তেল , কখনো বা বেগুন দিয়ে সিম্পল ঝোল।  ইলিশের ডিম্ দিয়ে অম্বলও করতেন  অনেকে। এখনো পকেট বাঁচিয়ে এক আধদিন ইলিশ উৎসব হয় বটে।  তবে বলাই বাহুল্য মুদ্রাস্ফীতির এই বাজারে ইলিশের সেই কদর করবার বাঙালি এখন হাতে গোনা। পকেট থাকলেও সেই মন , সেই ভোজন রসিক কজনই বা আছেন আজ।  ভেবে দেখুন সেই পোড়া দিনে ফুড ম্যাগাজিন , ইউটিউব চ্যানেল , সুদিপার রান্নাঘর কিছু ছিল না। পাড়ার মোড়ে বিরাট রেস্তোরা , খাবার অর্ডারের অপ্প্লিকেশন কিছুটা না। মা , কাকিমা , ঠাকুমা , দিদিমারাই হৃদয় উজাড় করে রসনার সর্বোচ্চ শিখরে নিয়ে যেতেন আমাদের। ইস্টবেঙ্গলের প্রতীক যেন ইলিশ মাছ , কিন্তু এই একটি ব্যাপারে মোহনবাগানও এক সুর।  ঘটি হোক বা বাঙাল ইলিশ সর্বজনীন প্রেমিকা। বাবু কালচারের নিভু নিভু সময়েও আভিজাত্যের প্রতীক ছিল ইলিশ। বাজার থেকে দু কিলো ইলিশ কিনে না কেটে ঝুলিয়ে সক্কলকে দেখিয়ে দেখিয়ে ঘরে ফিরতেন বঙ্গ  বাবুরা। এখন ভায়া বোনলেস ইলিশের যুগ।পুরো  কলিকাল।  ইলিশ সুন্দরী আর কিছুকাল আমাদের সাথে ঘর কোরো গো প্লিজ।
 
কয়েকটা আনকমন রেসিপিও দিলাম ইলিশের। আমাকে রাঁধতে বলবেন না।  বলাই বাহুল্য রেসিপিগুলো সবই টোকা। আমিতো বাড়িতে আবদার করছি রেঁধে খাওয়াবার। আপনারাও ট্রাই করে জানান।
 
ইলিশ মালাইকারি  
 উপকরণ :
১. ইলিশ ৬-৮ টুকরা , ২. পেঁয়াজবাটা ১ কাপ, ৩. আদাবাটা ১ চা-চামচ, ৪. পোস্তবাটা ১ টেবিল-চামচ, ৫. শুকনো মরিচগুঁড়া আধা চা-চামচ, ৬. কাঁচা মরিচ ৩-৪টি, ৭. লবণ পরিমাণমতো, ৮. তেল ১ কাপ, ৯. নারকেলের দুধ ২ কাপ, ১০. চিনি স্বাদমতো, ১১. মালাই ৪ টেবিল-চামচপ্রণালি :
মাছ ধুয়ে, মাছে সামান্য লবণ মাখিয়ে রাখুন। এবার কড়াইয়ে তেল গরম করে একে একে পেঁয়াজবাটা, আদাবাটা, পোস্ত, মরিচগুঁড়া ও পরিমাণমতো লবণ দিয়ে কষিয়ে নারকেল দুধ ফুটিয়ে নিন। এবার মাছের টুকরো দিয়ে কাঁচা মরিচ ও চিনি ছড়িয়ে ঢেকে দিন। ৫-৭ মিনিট পর মাছের টুকরোগুলো উল্টিয়ে দিয়ে আবারও ঢেকে দিন। ঝোল মাখা মাখা হলে উপরে মালাই দিয়ে নামিয়ে ফেলুন।
 
আনারস ইলিশ  
 উপকরণ :
১. ইলিশ মাছ ১টা (৮ টুকরা), ২. আনারস দেড় কাপ (গ্রেট করা), ৩. পেঁয়াজকুচি কোয়ার্টার কাপ, ৪. কাঁচা মরিচ ফালি ৪-৫টা, ৫. হলুদগুঁড়া আধা চা-চামচ, ৬. মরিচগুঁড়া ১ চা-চামচ, ৭. আদাবাটা ১ চা-চামচ , ৮. চিনি আধা চা-চামচ (বা প্রয়োজনমতো), ৯. তেল আধা কাপ, ১০. লবণ পরিমাণমতোপ্রণালি :
মাছের টুকরোগুলো লবণ ও লেবুর রস দিয়ে মাখিয়ে ১০-১৫ মিনিট রেখে দিন। কড়াইয়ে তেল গরম করে পেঁয়াজকুচি নরম করে ভাজুন। এবার হলুদগুঁড়া, আদাবাটা, লবণ ও কাঁচা মরিচ দিয়ে কষান। গ্রেট করা আনারস দিয়ে নেড়ে ভালো করে কষিয়ে সামান্য পানি দিন। ফুটে উঠলে মাছগুলো দিয়ে মৃদু আঁচে ঢাকনা দিয়ে ঢেকে দিন। পানি শুকিয়ে মাখা মাখা হলে চিনি দিয়ে নেড়ে নামিয়ে নিন।
 
বেকড ইলিশ    
 উপকরণ :
১. ইলিশ মাছ ১টা, ২. লাল মরিচগুঁড়া ১ টেবিল-চামচ, ৩. পেঁয়াজবাটা ২ টেবিল-চামচ, ৪. টকদই ২ টেবিল-চামচ, ৬. লেবুর রস ১ টেবিল-চামচ, ৭. ভিনেগার ১ টেবিল-চামচ, ৮. সরিষার তেল ৩-৪ টেবিল-চামচ, ৯. লবণ পরিমাণমতো, ১০. কাঁচা মরিচ (চপ করা) ৩-৪টি, ১১. আদার রস ১ টেবিল-চামচ, ১২. তন্দুরি মসলা ১ চা-চামচ, ১৩. অ্যালুমিনিয়াম ফয়েলপ্রণালি :
আস্ত মাছকে ছুরি দিয়ে চিরে দিন, যাতে মসলা ভেতরে যেতে পারে। এবার লবণ মাখিয়ে এক ঘণ্টা রেখে দিন। বাটিতে সব মসলা মাখিয়ে নিন। মাখানো মসলা মাছের দুই পাশে ভালোভাবে লাগিয়ে ফয়েলের উপর রেখে ফয়েলটি মুড়িয়ে নিন। আভেন ফ্রি হিট করে ১৮০ ডিগ্রি তাপমাত্রায় ৩০-৪০ মিনিট বেক করে নামিয়ে নিন। লেবু চাক চাক করে কেটে, মাছের চিড়ে নেওয়া জায়গাগুলোতে ঢুকিয়ে পরিবেশন করুন।
রেসিপি : মাসুমা আলী রেখা
Facebook Comments