দূর বাবা এ কোথায় এলাম রে। ভরা বর্ষায় বাবা আর থাকার জায়গা পেল না। একে মশার কামড় তায় কারেন্ট নেই। পাটভাঙা কূর্তিটাও ভিজে একশা। মায়ের কথা রাখতে কেনই বা যে এটা পড়ল, এই ভেবে এখন দাঁত কামড়াচ্ছে কৃষ্ণা। কোথায় ঝুম বৃষ্টিতে পাবে বসে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেবে। আর কোথায় এই অবন্তীপুরের চায়ের দোকান। নিদারুন রসিকতায় নিজেই একবার হেসে উঠল সে। মামা যে বলল কাকে একটা পাঠাচ্ছে। সে যে রেসিং কার চেপে আসছে কিনা কে যানে। মায়েরও বলিহারি বাবা। কাল সকালেই না হয় দিদুর কাছে যাওয়া যেত। না, এখনই যাও। উফঃ বাবা গো কি বিটকেল গন্ধ। এরা কি জামাকাপড় বছরে একবার কাঁচে। অন্নপ্রাশনের ভাতকে গলায় প্রায় আটকে দিয়েই একথা বলল কৃষ্ণা। গোপালকাকা মশা তাড়াতে ততক্ষণে ডিমের ফাঁকা ট্রেতে আগুন ধরিয়েছে। ধোঁয়ায় মশা পালাই পালাই করলেও গন্ধে গোটা দোকান ম ম করছে। সঙ্গে খেতমজুরি করে ভিজতে ভিজতে দোকানে আসা খদ্দেরদের গায়ের গন্ধ জুড়েছে। ঘামে ভেজা জামায় বৃষ্টির জল পড়ে এমন গন্ধ আসছে যে কহতব্য নয়। এখন মর্কটটা এলেই কৃষ্ণা বাঁচে। ভিড়ের মধ্যে থেকে শুনতে পেল। এবার আমরা যাব আসুন। গোপালকাকাও বলে উঠলেন যাও দিদি শুভুবাবু তোমায় পৌঁচে দেবে। তবে নাম শুনলেও শুভুবাবুর মুখটা দেখতে পায়নি কৃষ্ণা। দোকানের বাইরে পা দিয়ে তার সাইকেলেই চড়ে বসেছে।  একমাথা কোঁকড়া চুলের শুভুবাবু বোধহয় শুভ। গোপালকাকার যা অ্যাকসেন্টের বহর তাতে করে অবাক হয়নি কিষ্ণা থুরি কৃষ্ণা। এই ভেবে নিজের মনেই হেসে উঠল সে। হাসির শব্দ পেয়ে সাইকেল থামিয়ে কিছু হয়েছে কি না জানতে চাইল শুভ। কৃষ্ণার থেকে সাড়া পেয়ে বলল, সামনে জল আছে সাবধানে বসুন। জল ভেঙে সাইকেলে চড়ে যেতে প্রথমে ভয় করলেও বেশ রোমাঞ্চের গন্ধ পাচ্ছিল কৃষ্ণা। যাক বাবা ফিরে গিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করার একটা কিছু তো পেল। ভাগ্যদেবী কিন্তু অলক্ষ্যেই হাসলেন। তবে খুশিখুশি ভাবটা বেশিক্ষণ টিকলো না ফের ঝেঁপে বৃষ্টি এলো। একা থাকলে টেনে বেরিয়ে যেত শুভ। কিন্তু কৃষ্ণাকে সঙ্গে নিয়ে সেই সাহস দেখাল না। সরকারদের গ্যারাজের সামনে সাইকেল দাঁড় করাল। কৃষ্ণাকে ছাউনির দিকে দিয়ে বাইরের দিকে থাকল নিজে। জলজঙ্গলে হঠাৎ বৃষ্টিতে বেজায় ভয় পেয়েছে মেয়েটা। ঝিঁ ঝিঁ ডাক, বৃষ্টির শব্দ, সবমিলিয়ে এক গা ছমছমে ভাব। চুপাচাপ দাঁড়িয়ে না থেকে কথা শুরু করবে কি না ভাবছে। এমন সময় বিদ্যুৎ চমকাতেই কৃষ্ণা একেবারে শুভর গায়ে এসে পড়ল। তবে সম্বিৎ ফিরতেই যে যার জায়গায় চলে গেছে। এক লহমায় দুজনই দুজনকে দেখতে পেয়েছে। ভয়ে ঠান্ডায় মেয়েটা কাঁপছে। বৃষ্টির বেগ কমতেই বেরিয়ে পড়ল দুজনে। অনেক্ষণ বাইরে আছে সকলে চিন্তা করবে। তাছাড়া ফিরে গিয়ে মাকে ফোন করে দেরি করে ফেরার কথাটা জানাতে হবে। ম্যাচও শুরু হবে হবে করছে। ফের বিদ্যুৎ চমকাতেই শুভ বলে উঠল ধরে বসুন পড়ে যাবেন। আশ্বাস পেয়ে ডান হাতটা শুভর কাঁধে রাখল কৃষ্ণা। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই অষ্টমীর আলতা পড়া পায়ের কথা মনে পড়ে গেল শুভর। ততক্ষণে স্যারের বাড়ির উঠোনে পৌঁছে গেছে তারা। তোয়ালে হাতে বাইরে বেরিয়ে এসেছেন স্যারের মা। নাতনিকে ভিতরে নিয়ে যেতে যেতে শুভকেও কলঘরটা দেখিয়ে দিলেন। মাথা মুছে স্যারেরই একটা পাঞ্জাবি গলিয়ে ধুতিকে লুঙ্গির মতো করে পড়ে নিয়েছে শুভ। বেঢপ লাগছে তাকে। বৈঠকখানায় আসার পথে আরও একবার দৃষ্টি বিনিময় হল কৃষ্ণার সঙ্গে। দিদার থান জড়িয়ে নিয়েছে সে। অনভ্যস্ত হাতে শাড়ির কুঁচি সামলাচ্ছে। পা চালিয়ে ঘরে চলে এল শুভ।

সেখানে তখন গম্ভীরের আউট হওয়ার বিশ্লেষণ চলছে। মধ্যমণি হয়ে বসে আছেন স্যার। দেখে কে বলবে পড়ানোর সময় এই মানুষটা কত সিরিয়াস। দরজার বাইরে একটু আগে কী ঘটে গেল কেউ জানতে পারল না, দুজন ছাড়া। শুভকে দেখতে পেয়ে বন্ধুরা হইহই করে উঠেছে। দেরি করে আসায় সে কি কি মিস করল তার ফিরিস্তি শুরু করেছে রূপক। এর মধ্যে ম্যাককালাম আউট হতেই সবাই হায় হায় করে উঠল। ২০ ওভারের খেলা শেষ। চা বিরতিতে ভিতর বাড়িতে গেলেন স্যার।গম্ভীরের মুণ্ডুপাত শুনতে শুনতেই বারবার বিদ্যুৎ চমকের ঘটনায় ফিরে যাচ্ছিল শুভ। তোলপাড় চলছে তার ভিতরে। স্যার এসে খবর দিলেন বাবা এসেছেন তাকে নিতে। তবে খেলা শেষ হলে স্যার বাড়ি পৌঁছে দিয়ে আসবেন শুনে চলে গেছেন। রাতে এবাড়িতেই খিচুড়ি খেয়ে নেবে সবাই। এমনটাই ঠিক হয়েছে। দেখতে দেখতে দ্বিতীয়ার্ধের খেলা শুরু হয়ে গেল।

ক্রমশ…

শাম্মী

শাম্মী

বেশ কিছু বছর ধরেই পেশাগত সাংবাদিকতা জীবনের পাশাপাশি গল্প , কবিতা লেখালিখি করেন। ইতিমধ্যেই তার একাধিক লেখা বহু মানুষের কাছে উচ্চ প্রসংশিত। 

Facebook Comments