স্কুল থেকে ফিরে ঘুমিয়ে পড়েছিল। মা ডাকতেই ধরমড়িয়ে উঠে সাইকেল নিয়ে বেড়িয়ে পড়েছে শুভ। তাড়াহুড়োতে স্কুলের বই খাতাই ব্যাগে থেকে গেছে। এমনকী, সেকেন্ড পেপারের বইটিও সঙ্গে নেওয়া হয়নি। ঝিলপাড়ের কাছাকাছি চলে আসার পর সেকথা মনে পড়তে নিজের মাথায় নিজেই গাট্টা মারলো সদ্য কৈশোর পেরোনো ছেলেটি। পাছে দেখতে পেয়ে কেউ তাকে পাগল ভাবে তাই তৎক্ষণাৎ নিজেকে সামলেও নিল। কোয়ার্জাইট নিয়ে আজ দীর্ঘ আলোচনা করবেন স্যার। তাই দ্রুতপায়ে প্যাডেলে চাপ দিল শুভ। সমীরস্যারের বাড়িতে পৌঁছে সাইকেল রাখার আগেই বৃষ্টিটা চলে এলো। সঙ্গে সঙ্গেই মন খারাপ হয়ে গেল তার। ভেবেছিল রূপককে বলবে সেকেন্ড পেপারের বইটা বাড়ি থেকে আনতে। আগের দিনের পড়া নিয়ে কিছু জট পেকেছে স্যারের কাছ থেকে তা বুঝতে হবে। কিন্তু রূপকটা যা অলস এই বৃষ্টিতে ও আর বাড়িমুখো হবে না। পড়া শুরুর আগেই বিরক্তিতে কুঁচকে গেল শুভর মুখ। সব রাগটা গিয়ে পড়ল বৃষ্টির উপরে। এরমধ্যে অমিত ও আকাশকে বাদ দিয়ে সবাই চলে এসেছে। শুভ বসতে না বসতে সবাই হা হা করে উঠল। একটাই বক্তব্য আজ পড়া শেষে স্যারের বাড়িতে বসেই IPL ম্যাচটা দেখতে চায় সবাই। প্ল্যান ঠিক হয়ে গেছে। শুভ হ্যাঁ বললেই স্যারকে বলা হবে। তিনিও না করবেন না। এখন শুধু শুভর হ্যাঁ বলার অপেক্ষা। না বললেই য়ে শুভ ছাড় পাবে এমন কিন্তু নয়। খেলাটা তারা দেখছেই, শুভকেও সঙ্গে থাকতে হবে। অগত্যা পড়া শেষে পুরোনো পড়া বুঝে নেওয়ার বিষয়টিতে আজকের মতো ইতি পড়ল। এমন সময় ভিজে ঝুপসি হয়ে বাড়ি ঢুকলেন স্যার। একবার বৈঠকখানায় উঁকি দিয়ে ভিতর বাড়িতে গেলেন। সবাই ততক্ষণে কোয়ার্জাইটে মন দিয়েছে।

পাঁচ মিনিটের মধ্যে স্যার এলেন পড়াও শুরু হয়ে গেল। একটা মকটেস্ট হবে সামনের সপ্তাহে। তানিয়ে বেশ খানিকটা সময় আলোচনা হল। তারপর চকমকি পাথর নিয়ে বলতে শুরু করলেন স্যার। এবিষয়ে একটা কথা বলে রাখি। সহজ করে পড়া বুঝিয়ে ছাত্রকে গড়েপিটে নিতে সমীরস্যার অদ্বিতীয়। একাজে তাঁর জুড়ি নেই।  তাই স্যার আসতেই পড়া শুরু। এর মধ্যে কখন যে আবার ঝেঁপে বৃষ্টি এসেছে কেউ খেয়াল করেনি। চমক ভাঙল স্যারের মায়ের ডাকে। সেই সঙ্গে এলো গরম তেলেভাজার বাটি। বই খাতা সরিয়ে তেলেভাজায় কামড় বসিয়েছে শুভ। এমন সময় ডাক পেয়ে বাড়ির ভিতরে গেলেন সমীরস্যার। সেই সুযোগে খাওয়ার পাশাপাশি প্রীতি জিন্টার টিমকে শাহরুখের টিম কেমন টেক্কা দেবে তানিয়ে জোর আলোচনা শুরু হয়ে গেল। এর মধ্যে স্যার ফিরে এসেছেন। আলোচনায় বাধা না দিয়ে শুভকে ডেকে নিলেন। তাঁর বোনঝি এসেছে দিল্লি থেকে। এখন বৃষ্টির মধ্যে ঝিলপাড়ের রায়বাড়ি থেকে বেরিয়েছে। জমা জলের ভয়ে রিকশো এপাড়ে আসতে চাইছে না। শুভ যেন তাকে সঙ্গে করে নিয়ে আসে। তবে রায়বাড়ি পর্যন্ত উজিয়ে যাওয়ার দরকার নেই সে পোড়ো শিবতলায় গোপাল চাওয়ালার দোকানে আছে।

 

স্যারের আদেশ পাওয়া মাত্র সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে গেল শুভ। বৃষ্টিটা এখন একটু ধরেছে। তবে রাস্তায় জল দাঁড়িয়ে যাওয়ায় সাইকেলের গতি বাড়াতে পারছে না। সামনে পরীক্ষা, এখন জলে ভিজে বিছানা নেওয়ার কোনও সাধ জাগেনি শুভর। পোড়ো শিবতলায় এসে সাইকেল দাঁড় করাতেই আবার হুরমুড়িয়ে বৃষ্টিটা নামল। মাথা বাঁচাতে গোপালের চায়ের দোকানের দিকেই ছুটল। সেখানে তখন তিলধারণের জায়গা নেই। চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে রাজভবন থেকে রাইসিনা হিলস সব নিয়েই তর্ক চলছে। প্রতিভা পাটিলের জায়গায় প্রণব মুখুজ্জে আদৌ বসতে পারবেন কি না। বাঙালির মুখ পুনরায় উজ্জ্বল হবে কি না, তানিয়ে কি বিষম চিন্তা তখন। এদিক সেদিক থেকে সন্ধ্যার ম্যাচর খবরও কানে আসছে। কেউ আবার বলল, ভাগ্গিস চিন্নাস্বামীতে ম্যাচ। কলকাতায় হলে আর দেখতে হত না। এখানে যা আষাঢ়ে আলাপন চলছে তাতে ম্যাচ পণ্ডই হত। অন্য সময় হলে কান পেতে ফোকটে এসব কানাকানি শুনতে মন্দ লাগে না। মাথা ভরতি জল নিয়ে এখন আর ভাল্লাগছে না। মেয়েটা যে কোথায় গেল। মুখের কথা খসানোর আগে গোপালকাকা একগাল হেসে বলে উঠল এসে গেছো শুভুবাবু(শুভকে এই নামেই ডাকেন গোপালকাকা)। কিষ্ণাদিদি কখন থেকি অপেক্ষা করতিছে। বাদলা কমলে তাকে মাস্টারবাবুর বাড়ি পৌঁচে দাও দিকিনি।

গোপালকাকার কথাতে এবার দোকানের ভিতরে চোখ পড়ল। হাতলভাঙা কাঠের চেয়ারে নিতান্তই অনিচ্ছায় বসে আছে সে। কুপির আলো, উনুনের আগুনেও স্পষ্টভাবে মুখটা দেখতে পেল না শুভ।

                                                                                                                                                                                                                                         ক্রমশ  …

 

 

শাম্মী

শাম্মী

বেশ কিছু বছর ধরেই পেশাগত সাংবাদিকতা জীবনের পাশাপাশি গল্প , কবিতা লেখালিখি করেন। ইতিমধ্যেই তার একাধিক লেখা বহু মানুষের কাছে উচ্চ প্রসংশিত। 

Facebook Comments