আকাশের আজ মন খারাপ, তাই ভোর থেকে বৃষ্টির বিরাম নেই। শেষরাতে ঝিরিঝিরি বৃষ্টির আমেজ টের পেয়ে চাদরটা আষ্টেপৃষ্ঠে গায়ে জড়িয়ে নিয়েছিল শুভ। নাহ এই আবহাওয়ায় জমিয়ে একটা ঘুম না দিলেই নয়। বেখেয়ালে যদি আয়েশি ঘুমটা ভাঙে তাহলে যেন এই বর্ষণমুখর দিনটাকেই অপমান করা হয়। অতঃপর  চাদরে মাথা ঢেকে ঘুমে মনোনিবেশ।

উফঃ কি ঝেঁপে বৃষ্টি এলোরে বাবা। মুখে বিরক্তি সূচক আওয়াজ করে বাস স্টপেজের ছাউনির নির্ভরযোগ্য কোণটি খুঁজছিল শুভ। সেই সকালে বেরিয়েছে। পাছে দেরি হয়ে যায় তাই ব্রেকফাস্টও করতে পারেনি। যেভাবেই হোক সমীরস্যারের বাড়িতে আজ যেতেই হবে। তার লাইটট্রেসিংয়ের খাতা সেখানেই পড়ে আছে। বন্ধুদের সুবিধে হবে বলে দিন ১৫ আগে খাতাটা রেখে এসেছিল। সবাই টিউশনি পড়তে গিয়ে প্র্যাকটিক্যাল পরীক্ষার কাজগুলো তার খাতা দেখে করে নিয়েছে। তবে খাতাটা শুভর বাড়িতে দিয়ে যায়নি। অথচ ক্লাসের অর্ধেকের বেশি বন্ধু এপাড়াতেই থাকে।মনে মনে বন্ধুদের গালমন্দ করতে করতে কটমট করে রাস্তার জমা জলের দিকে তাকিয়ে রইল শুভ। পেটে ছুঁচোয় ডন মারছে।কাছে টাকা যা আছে গোটা চারেক কচুরি আর খানদুয়েক জিলিপ দিয়ে দিব্যি ভরপেট খাওয়াটা হতে পারে। কিন্তু বৃষ্টি বাদ সেধেছে। প্রাণের প্রিয় প্র্যাকটিক্যাল খাতার কোনওরকম ক্ষতি সে মেনে নিতে পারবে না। তাতে একবেলা পেটে কিল মেরে পড়ে থাকতে হয় তো তাই সই। বৃষ্টিটা কমার কোনওরকম নামগন্ধ নেই। তবে সকালে যখন মা তাকে বিছানা থেকে তুলে দিল তখন তো বেশ রোদ ঝলমল করছিল। তারপর কখন যে কী হল, আকাশ এমন মুখ কালো করে কাঁদতে বসল। ভাবতে ভাবতেই স্যারের বাড়ির চৌকাঠে কৃষ্ণার ছবিটা ভেসে উঠল। আচ্ছা তখন থেকেই কি বৃষ্টি পড়ছে ? ঠিক মনে করতে পারছে না শুভ। কৃষ্ণার চোখে জল এলেই তো আকাশের মুখ ভার হয়, এটা নতুন কিছু না। এর আগেও বন্ধুরা মিলে এনিয়ে কম ঠাট্টা তামাশা করেনি। নাহ, এটা নিয়ে বেশি ভাববে না সে। আবার মাথার মধ্যে সব জট পাকিয়ে যাবে। সামনেই উচ্চ মাধ্যমিক, এখনও প্রস্তুতি বাকি রয়েছে। বৃষ্টির গতিবেগ দেখে ভিড়ে ঠাসা ছাউনির মধ্যে আরও সেধিঁয়ে গেল শুভ।

 

কিন্তু কৃষ্ণাকে মন থেকে তাড়াতে পারলো না। কৃষ্ণা, ঝিলপাড়ের নতুন পাড়ায় মুখে মুখে ফেরা একটা নাম। গান, কবিতা, বিতর্কের পাশাপাশি পড়াশোনাতেও বেশ চৌখশ। সাইকেল নিয়ে মাঠে, বন্ধুর বাড়ি বা ক্লাব যেখানেই যাই না কেন কৃষ্ণাদের প্রাসাদোপম বাড়িটায় চোখ আটকাবেই। এপাড়ায় অতবড় বাড়ি আর কারওদের নেই। তবে বাড়ির মতই বাসিন্দারে মনগুলোও বেশ বড়। বছরঘুরে যখন মা দুগ্গা আসে তখনই তার আভাস পাওয়া যায়। কোনও এক বছর অষ্টমীর অঞ্জলি দিতে গিয়েই প্রথম দুর্গা থুরি কৃষ্ণাকে দেখেছিল শুভ। বয়সজনিত কারণে তখন শুধু মুগ্ধতা ভর করেছিল শুভর চোখে। পাড়াতে একটাই বাড়ির পুজো তাই সাতসকালেও ভিড়ের খামতি ছিল না মণ্ডপে। ঠাসা ভিড়ে কৃষ্ণার আলতা রাঙানো পায়ের উপরে গিয়ে পড়েছিল শুভর পা। মুখে বিরক্তির ছাপ ফুটে উঠলেও একটাও কথা বলেনি কৃষ্ণা। বুঝতে পেরে শুভই নিজের পা সরিয়ে নিয়েছিল। তবে সেদিনের পরে বাকি দুদিনে একবারও পুজোবাড়িতে কৃষ্ণাকে দেখতে পায়নি সে। রায়বাড়ির পুজো এ অঞ্চলে বেশ পুরোনো। আত্মীয়স্বজনদের মুখও মোটামুটি চেনা। সেই ভিড়ে কৃষ্ণাকে দেখতে না পেয়ে একটু হতাশ হলেও শুভ ভেবেছিল মেয়েটি হয়তো কোনও প্রতিবেশীদের আত্মীয়।পুজোর ছুটিতে বেড়াতে এসেছিল। পুজো শেষ হতেই ফিরে গেছে। ভুল ভাঙল মাস ছয়েক পর।

ক্লাসের ভালো ছেলে শুভর এমনিতে কোনও মাস্টারমশাই ছিল না। নাইনে ওঠার পরেও প্রথমে আলাদা পড়ার কথা ভাবেনি। পড়ে মডেল হাইস্কুলের ভূগোল স্যারের বাড়িতে সবাইকে পড়তে যেতে দেখে সেও গোঁ ধরে। পরের বছর বোর্ডের পরীক্ষা, তাই ছেলের এ হেন আবদার হাসিমুখেই মেনে নিয়েছিলেন ধীমানবাবু ও রজনীদেবী। অল্প কয়েকদিনের মধ্যেই সমীরস্যারের চোখের মণি হয়ে ওঠে শুভ।

ক্রমশ…

শাম্মী

শাম্মী

বেশ কিছু বছর ধরেই পেশাগত সাংবাদিকতা জীবনের পাশাপাশি গল্প , কবিতা লেখালিখি করেন। ইতিমধ্যেই তার একাধিক লেখা বহু মানুষের কাছে উচ্চ প্রসংশিত। 

Facebook Comments