‘ অলিফা ‘ নান্দীকারের নতুন নাটক। নির্দেশক সোহিনী সেনগুপ্তর কথায় অলিফা শব্দটির উৎস বর্ণমালার প্রথম স্বর , ‘ অ ‘ , আলফা , অলিফা। নাট্যভাবনা কোনও একটা নির্দিষ্ট ভাবনাকে আশ্রয় করে নয়।  বরং বলা যায় একাধিক স্বর যেন মিশে একটা সুর তৈরি করেছে। নাটকটি কিন্তু প্রসেনিয়ামের চেনা ছকে এগোয়নি। বরং দুটো চরিত্র বারবারই মনোলগের মাধ্যমে ঘটনাক্রমকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন। সেই মনোলগে কখনও গল্পের মূখ্য দুই চরিত্র ভাব বিনিময় করেছেন দর্শকের সাথে। কখনও বা সোহিনী অভিনীত চরিত্র কথা বলেছে তার বন্ধু আসফার সাথে। আসফাকে কখনই দেখা যায়নি। তবু তার নাম ঘুরে ফিরে এসেছে বারবার। এমনকি নাটকের একেবারে শেষে আসফা নামটিই নাটককে তার লক্ষ্যস্থলে নিয়ে গেছে। 
অলিফা নাটকটি এক বড়লোক নেতার উচ্ছন্নে যাওয়া ছেলে আর মাসির কাছে বড় হওয়া একটি মেয়ের গল্প।গল্প দুটো সুরে আলাদা মাত্রায় মঞ্চের দুপাশে এগোতে থাকে। একদিকে সোহিনী অভিনীত চরিত্র গল্প জুড়ে দেন তার বন্ধু আসফার সাথে। সে গল্প পড়াশুনার গল্প , ফুলের গল্প। তার মাসির গল্প। অন্যদিকে অন্য চরিত্রটি অন্ধকারের গলি ঘুজি ধরে তার জীবনের গল্প শোনায়। যে  জীবনে মদ উশৃঙ্খলতার গলি পথ বেয়ে সে একদিন এক অন্ধকার গলির এক মেয়ে মানুষের কাছে পৌঁছয়। গল্পের আচমকা বাঁক বলে দেয় সেই মেয়ে মানুষই আর কেউ নয় নাটকের অন্য চরিত্রের মাসি। মঞ্চের একদিকে মেয়েটি তখন শোনাচ্ছে আচমকা তার মাসির বেশ অর্থনৈতিক উন্নতি হয়েছে। সে ইংরেজী স্কুলে ভর্ত্তি হয়েছে। অন্যদিকের চরিত্রটি স্মৃতিচারণার স্টাইলে বলতে থাকে কিভাবে তাকে , তার তনু মন প্রাণ বশ করে সেই মহিলা ইচ্ছেমতন বা বলা ভালো আবদার মতন অর্থ নিয়ে চলেছে তার থেকে। এরপরেই নাটকের ঘটনার আরেক বাঁক। মেয়েটির মাসি , এবং সেই লম্পট ছোকরার মেয়েমানুষ যারা আসলে একই মানুষ আচমকাই মারা যান। কদিনের কাশিতে ভুগতে ভুগতে। এ অবধি বলাই বাহুল্য দুটি চরিত্রই কিন্তু কেউ কাউকে দেখেওনি , চেনেওনা। এমনকি কেউ কারুর অস্তিত্ব সম্পর্কেও অবগত নয়। 
গল্পের গতিপথ এরপরেও এগিয়েছে নানা ছন্দে। শেষমেষ ক্লাইম্যাক্স ঘনিয়েছে। সোহিনী সেনগুপ্ত অভিনীত চরিত্রটি একসময় বড় হয়। হয়ে ওঠে স্থানীয় অ্যাডাল্ট এডুকেশনের শিক্ষিকা। যে বর্ণমালার সাথে ছোট্ট কিশোরির কিংবা জীবন যন্ত্রনায় বিদ্ধ গৃহবধুর পরিচয় ঘটায় নিজস্ব ভঙ্গীতে। তার জীবনবোধ যেন তাকে বর্ণমালার স্বরধ্বনিগুলোকে নতুন ভাবে চিনতে সাহায্য করেছে। বাংলা নাট্যমঞ্চে সোহিনী সেনগুপ্ত দীর্ঘদিন ধরেই উজ্জ্বল ধ্রুবতারা। মঞ্চে তার সহজাত অভিনয় গুনে যখন সে বর্ণমালার সাথে দর্শকের পরিচয় ঘটার গায়ে কাঁটা দেয়। বর্ণমালার ‘ অ ‘ ‘আ ‘ ‘ই ‘ ‘ঈ ‘ যেন চরিত্রের মত বাস্তব হয়ে ওঠে মঞ্চে। 
বর্ণমালার স্বরধ্বনি যেন কখনও আরামের স্বর কখনও ভাবের , কখনও ভালোবাসার , কখনও সেই বর্ণমালার স্বরধ্বনিই যন্ত্রণার। দুঃসহ যন্ত্রণার , কান্নার , প্রতিবাদের। ‘ অলিফা ‘ নাটকটি একদিকে যেমন নারীর অধিকারের কথা বলে , ক্রমবর্দ্ধমান নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে কথা বলে , তেমনি নারীর নিজস্ব ভাব , ভালোবাসা , যন্ত্রনা প্রতিবাদের সাথে বর্ণমালাকে মিশিয়ে দেয়। স্পর্ধার কথা বলে। স্পর্ধিত বর্ণমালার কথা বলে। গোটা নাটক যেন আসলে কথা বলে দর্শকের সাথে। সোহিনী সেনগুপ্তর নির্দেশনা যথাযথ। নাটকের দুটি চরিত্রই প্রাণবন্ত। ন্যারেটিভ নিয়ে নিজস্ব এক্সপেরিমেন্টে ভীষণ সফল। 
চিত্রগ্রাহক : শুভশ্রী দাস 
 মানস বন্দ্যোপাধ্যায়

মানস বন্দ্যোপাধ্যায়

সম্পাদক , আসমানিয়া

প্রথম জীবনে নিউজ চ্যানেলের ক্রাইম রিপোর্টার। পরবর্তীতে আসমানিয়ার প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক। দীর্ঘদিন ধরেই লেখালিখি করেন বিভিন্ন পত্র পত্রিকায়।

Facebook Comments