রুশ দেশের সেই মানুষটি তখন হণ্যে হয়ে খুঁজছেন তিনজন অভিনেত্রী। সময়টা অষ্টাদশ শতকের এক্কেবারে শেষ দিক। সেই সময় থিয়েটারের জন্য বাঙালি অভিনেত্রী পাওয়া প্রায় অসাধ্য ছিল। এমনকি তার বহু বহু দশক পড়েও এমনকি দুই শতাব্দী পেরিয়েও বাংলা নাট্যমঞ্চে অভিনেত্রীদের অনেকেই এসেছিলেন তথাকথিত নিষিদ্ধতার গন্ধমাখা পতিতালয় থেকে। এমনকি পুরুষ মানুষেরাও মহিলা সেজে মঞ্চ সামলানোর চেষ্টা করেছেন।  পাশাপাশি এলোকেশী , জগত্তারিণী , শ্যামা এইসব নামের অভিনেত্রীরাও বাংলা থিয়েটারে নাম করেছিলেন।বিগত কয়েক দশকের বাংলার নাট্য আন্দোলন তথা নাট্য ভাবনা নানা কারণে উদাসীন থেকেছেন এলোকেশীদের ইতিহাস নিয়ে। 
আলোচ্য ঘটনাকাল অবশ্য এলোকেশীদেরও বহু আগে। রুশ দেশীয় লেবেডেফ খানিকটা ভাগ্যান্বেষণ , খানিকটা নতুন কিছু করার তাগিদে কলকাতায় আসেন। লেবেডেফ অসাধারণ ভাষাবিদ এবং পাশাপাশি উচ্চমানের সুরসাধক ছিলেন। একটু বড় বেহালার মতন চেলো নামক একটি বাদ্যযন্ত্র বাজাতেন। অচিরেই কলকাতার অভিজাত সাহেব মহলে দারুণ সমাদর পেয়ে যান লেবেডেফ। কিণ্তু ঐ সুখে থাকতেও শিল্পীদের ভূতে কিলোয়। লেবেডেফকে পেয়ে বসল ভারতবর্ষের সাহিত্য , সংস্কৃতি। ১৭৮৯ সালে গোলকনাথ দাস নামক এক স্কুল শিক্ষককে পাকড়িয়ে সংস্কৃত , বাংলা , হিন্দি এইসব শেখা শুরু করেন লেবেডেফ।  বাংলা শিখেই পাশ্চাত্য সাহিত্য বাংলায় অনুবাদ করতে শুরু করেন। জডরেলের Disguise অনুবাদ করে নাম দেন ‘ কাল্পনিক সংবাদ ‘। নিছকই ভাষা পাল্টিয়ে ক্ষান্ত হননি লেবেডেফ। নাটকের মাদ্রিদ ও সেডিলকে কলকাতা ও লখনৌতে পাল্টিয়ে দেন তিনি। নাটকে যুক্ত করেন বহু ভারতীয় চরিত্র। এমনকি পালাগানের সাথে সাদৃশ্য আনতে বাজিগর , গায়ক , কমিক চরিত্র এইসবও নিয়ে আসেন। নাটক লিখে লেবেডেফ তার সংস্কৃতি শিক্ষক গোলকনাথকে বলেন আচ্ছা এ নাটক মঞ্চস্থ করলে হয়না ? গোলোকনাথ এক কথায় রাজি ! কলকাতায় তখন ইউরোপীয় থিয়েটার চলে বটে , কিন্তু বাংলা নাটক ভাবাই যায়না , আর বাঙালী দর্শকের জন্য নাটক তো কল্পনার অতীত।
এমন সময়েই বিপ্লবী সিদ্ধান্ত নিলেন লেবেডেফ এবং তার শিক্ষক গোলকনাথ। গোলকনাথ নাটকে অভিনয়ের জন্য এদেশের ১০ জন অভিনেতা এবং ৩ জন অভিনেত্রী যোগাড় করেন। নাটকে এই ৩ অভিনেত্রীর নাম ইতিহাসে হারিয়ে গেছে। অনেকেই বলে থাকে পতিতালয়ের তিন নারীই জীবনের অন্ধকার সরিয়ে সুস্থভাবে উপার্জনের তাগিদে এই নাটকে অভিনয় করতে আসেন। ব্যক্তিগত প্রভাব খাটিয়ে বড়লাট ডান শোরের কাছ থেকে কলকাতার কালো চামড়ার মানুষদের নিয়ে থিয়েটার করবার অনুমতি মিলল বটে কিন্তু ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী যথারীতি প্যাঁচ কষতে শুরু করলো , কলকাতার কোনও থিয়েটার হল কিংবা বড় বাড়ির হলঘরই লেবেডেফকে থিয়েটার পরিবেশনের অনুমতি দিল না। লেবেডেফ তো একরোখা। কলকাতায় বাংলা থিয়েটার হবেই হবে। অনেক কষ্টে জমানো টাকা দিয়ে ২৫ নং ডোমতলা লেনের (বর্তমান এজরা স্ট্রীট) একটি গুদামঘর ভাড়া নিলেন তিনি। নিজের হাতে একটি থিয়েটার হল ও দর্শকাসন বানালেন তিনি। খবরের কাগজে নাটকের বিজ্ঞাপন দিলেন। রঙিন পোস্টার সাঁটলেন কলকাতার রাস্তায়। ২৭ নভেম্বর , শুক্রবার মঞ্চস্থ হলো ‘ কাল্পনিক সংবাদ ‘। গুদামঘর তখন সাজ পাল্টে বেঙ্গল থিয়েটার। টিকিট কেটে নাটক দেখলেন ২০০ মানুষ।কলকাতায় প্রথমবার ইউরোপীয় ধাচে মঞ্চস্থ হলো বাংলা নাটক। বাংলা নাটক লেবেডেফের হাত ধরে দিগন্ত স্পর্শ করতে চেয়েছিল। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তা হতে দেয় নি। মিথ্যে মামলার হেনস্থা করতে শুরু করে তাকে। এমনকি গ্রেপ্তারও করে। ১৭৯৭ সালে কার্যত জোড় করে শূণ্য হাতে তাকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করা হয়। মূলত সেই ষড়যন্ত্রের হাত ধরেই লেবেডেফকে নিয়ে ইতিহাস চুপ , চুপ এবং ভীষণ চুপ। 
মানস বন্দ্যোপাধ্যায়

মানস বন্দ্যোপাধ্যায়

সম্পাদকঃ আসমানিয়া

Facebook Comments