ছোটবেলার আঁকার খাতার কথা মনে আছে… মোম রঙ্গের বাক্স… সব রঙ উজাড় করে সিনারী আঁকা, ঐ পাতা গুলোর কথা আমরা বোধ হয় অল্প বিস্তর সবাই মনে রেখেছি… রকমারি সবুজে ঢাকা পাহাড় তার নিচে রঙ বেরং-এর ফুলে ঢাকা বিশাল মাঠ… ঠিক তার পাশ দিয়েই বয়ে চলেছে ঘন নীল নদী, যার বুকে ছায়া ফেলেছে নীল আকাশের গায়ে ভেসে ভেসে থাকা সাদা মেঘ… এই ছবি দেখে কতবার মনে মনে কলার তুলেছি… ক্যামেল-এর রকমারি শেড-এর কল্যানে স্বর্গ এঁকে ফেলেছি ভেবেছি… এটাও ভেবেছি ছবি বলেই এতো সুন্দর… এতো বছর পরে যখন আঁকার খাতা হারিয়ে ফেলেছি (ভাগ্যিস হারিয়ে ফেলেছি মিলিয়ে দেখলে ক্যামেল-এর রঙের শেড আর আমার রংবাছাই-য়ের ক্ষমতা দুটোই লজ্জা পেতো) তখন আমার সেই আঁকার খাতার সেই সিনারী মুখোমুখি দাঁড়ালাম… জলজ্যান্ত বাস্তব সেই ছোটবেলার আঁকা রূপকথা… 

জায়গাটার নাম কুইন্সটাউন… এখানে ঐ পাহাড়টার নাম রিমার্কেবল আর ঐ নদী যেটা আসলে বিশাল একটা লেক নাম ওওয়াইটাকেপু আর নীল গোলাপী ফুল গুলোর নাম লুপিন… এক সাথে বহুকিছু বলে ফেললাম হয়তো… এক-এক করে এইবার চিনিয়েদি… 

নিউজিল্যান্ড…… নামটা শুন লেইফার্ন-এর পত্-আঁকা কালো জার্সির ক্রিকেট টিমটাকে মনে পরে তাইতো… দেশটাকে তেমন আমরা চিনি-জানিনা…

সিল্ভারফার্ন-এ মোড়া সবুজ, নীলে ঘেরা পৃথিবীর মাটিতে ছোট্ট স্বর্গের নাম নিউজিল্যান্ড… না, একটুও বাড়িয়ে সাজিয়ে গুছিয়ে বললামনা, বরং এই দেশটা কতটা সুন্দর সেটা বোঝাতে পারি এমন শব্দ-বাফ্রেজ এই মুহূর্তে খুঁজে পাচ্ছিনা… তার থেকে বরং আমি বলতে থাকি আপনারা নিজেরাই বুঝেনিন…

 

প্রশান্ত-মহাসাগরের বুকে অনেক দ্বীপের মতোই ছোট দুটো দ্বীপ নর্থ আর সাউথ আইল্যান্ড… এই ছোট্ট ছোট্ট দুটো দ্বীপ নিয়ে তৈরী ছোট্ট একটা দেশ নিউজিল্যান্ড… আর কুইন্সটাউন শহরটা হল সাউথ-আইল্যান্ড-এর একটা ছোট শহর… অনেক বেশি ভূগোল হয়ে যাচ্ছে… তবে বোঝানোর জন্য এইটুকু বলতেই হলো…  আমি এই দু’দিন আগে সাউ থথাইল্যান্ড থেকে ঘুরে এলাম আর এতটাই মুগ্ধ যে মানস-দার ‘আসমানিয়ার’ জন্য লিখতে বসেপড়লাম… আজকে শুধু কুইন্সটাউন নিয়েই বলি… নাহলে শেষ করতে পারবো না।। 

 

কুইন্সটাউন এ প্লেন নামার আগেই উপর থেকে কুন্সটাউন দেখে থমকে যেতেহয়… মানুষেরর তৈরী উঁচু ইমারতওয়ালা সাজানো-গোছানো শহর নয়… এখানে আছে শুধু নির্ভেজাল প্রকৃতি… আমি খুব লাকি আমি ভোর হওয়ার মুখে দেখতে পেয়েছিলাম রিমার্কেবল মাউন্টেন রেঞ্জ… যা ঘিরে রেখেছে কুইন্সটাউনকে… সূর্যের আভায় রাঙ্গা রিমার্কেবল… কোথাও লাল, কোথাও খয়েরি, পাহারের মাথা সূর্যের আলোয় কমলা আবার সবুজের গায়ে লাল মিশে পাহাড়কোথাও বেগুনী… এত রঙ একসাথে নিজের চোখকেই বিশ্বাস হয়নি… এটাও সম্ভব বলে… রিমার্কেবল পেরিয়ে প্লেন যখন মাটিতে পা রাখল তখন এক ঝলক-এর সৌন্দর্য দেখেই আমার থতমত অবস্থা… কোনোরকমে নিজেকে সামলে প্লেন থেকে নেমে সব কাজ সেরে এয়ারপোর্ট-এর দরজা দিয়ে বেরিয়েই কুইন্সটাউনের মুখোমুখি হাওয়ার জন্য বেশ উত্তেজিত, দরজা দিয়ে বেরোতেই হু-হু করে ছুটে আসা ঠান্ডা বুঝিয়ে দিলো কুইন্সটাউন -এর মেজাজ বেশ কড়া, তাকে বেশ সমঝে চলতে হবে… যাই হোক কোনোরকমে নিজেকে সামলে সামনে তাকাতেই আবার প্রেমে পরে গেলাম… গোল করে ঘিরে থাকা কমলাপাহাড়েরমধ্যে আসমানী নীল রঙের ঝকঝকে শহর আর শহরের বুক চিরেমুখোমুখি দুই পাহাড়েরমাথাছুঁয়ে আছে সাত রঙের রামধনু… ক্যামেলের এত ক্ষমতা নেই আমার নিজেরও বোধ হয় এত কল্পনা শক্তি নেই যে এই সৌন্দর্য খাতার পাতায় ফুটিয়ে তুলতে পারি… সবটা দেখতে দেখতে খেয়াল করলাম কয়েক মুহুর্তের জন্য আমি ভুলে গিয়েছিলাম আমার খুব ঠান্ডা লাগছে… এটাও সম্ভব আগে জানতাম না… সাধে কি শচীন তেন্দুলকর থেকে শুরু করে আরো অনেক বড় বড় ব্যাক্তিত্বের ড্রীম হলিডে প্লেস কুইন্সটাউন, বারবার তাঁরা আসতে চায় এখানে… সত্যিই সম্মোহনী শক্তি আছে এই শহরের… এইবার রাস্তায়ে নেমে ঘুরে দেখার পালা… পাহাড়ী সরু রাস্তা ধরে চলল গাড়ী, রাস্তার সাথেসাথে চলছে পাহার অন্য পাশে গাড় নীল লেক… আর সামনে ঝলমলে নীল আকাশ… এত রঙ, যে দিকেই তাকাচ্ছি যে মন নিজে থেকেই এত দিনের জমে থাকা দুঃখ, ছোটোখাটো মন খারাপ গুলো ভুলে গিয়ে একদম শান্ত, সারা মন জুড়ে শুধু ভালোলাগা।

কুইন্সটাউনে আমাদের প্রথম গন্তব্য ছিল টে আনু… ওটাও একটা লেককে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা ছোট জনপদ… এখানকার সব লেকই ভলক্যানো তে তৈরী হওয়া… বিশাল লেক গুলোকে প্রায় নদীর মত লাগে… ভাবলে অবাক হতে হয় এই জায়গা গুলোতে কী বিশাল বিশাল ভলক্যানিক ইরাপশান হয়েছিল… নেচার নিজের খেয়ালে ভেঙ্গে গড়ে খেলা করে চলেছে দেশটার সাথে।। আর এখানকার মানুষ মানিয়ে নিয়ে মিশে আছে প্রকৃতির সাথে… এখানে বেশীর ভাগ লেক যেতে হলেই লেক পর্যন্ত পৌঁছতে গেলে হাঁটতে হয় বেশ কয়েক কিলোমিটার… কারন লেকগুলো গভীর জঙ্গলে ঘেরা… চাইলেই গাছ জঙ্গল পরিষ্কার করে পিচ রাস্তা লেক পর্যন্ত বানানোই যায় কিন্তু এই দেশে প্রকৃতিই সব চেয়ে বেশী প্রাধান্য পায়… লেক দেখেতে হলে জঙ্গল টপকে পায়ে হাঁটা সরু পথ বেয়েই লেক পর্যন্ত পৌঁছতে হবে তার জন্য জঙ্গল পাহাড় কাউকে বিরক্ত করে মানুষের সুবিধে করে দেবে না এখানকার সরকার।

জঙ্গলে ঘেরা পাহাড়ী  রাস্তা বেয়ে আসতে আসতে দেখা হয়ে যায় কত রকম অচেনা পাখীর সাথে, কোনোটা  টুই, ফ্যান টেল, ফার্ন বার্ড… টুই নাম টা শুনে একটু অবাক লাগতেই পারে… ওটা মাউরি নাম… নিউজিল্যান্ড এর আদিবাসিন্দা এই মাউরি রাই… তারপর তা ইউরোপিয়ানদের কাছে আসে… সে ইতিহাসের কথা ওসব থাক… মাউরিরা যে নামে এই পাহার জঙ্গল প্রকৃতিকে  চিনেছে, ডেকেছে সেই ভাবেই, সেই নামেই পৃথিবী কে ইউরোপিয়ানরা চিনিয়েছে নিউজিল্যান্ড… যাই হোক জঙ্গলের রাস্তাতায় হাঁটাটাও একটা খুব সুন্দর অভিজ্ঞতা… নিজের চোখে দেখে ছুঁয়ে  নানা রকমের ফার্ন চিনলাম… সিল্ভার ফার্ন, ব্রাউন ফার্ন এরকম নানা ধরন… গভমেন্টের দেওয়া সাইনবোর্ড গুলো চিনতে আর জানতে খুব সাহায্য করে প্রতেকটা পদক্ষেপে… যতই ভালো হোক তবু তো প্লেন ল্যান্ড এ বড় হওয়া আর একটু অলস বদনাম থাকা বাঙ্গালী তাই কিছুটা যাওয়ার পর হাপিয়ে গিয়ে বিরক্তও হয়েছি কখনো… অনেকটা হেঁটে ক্লান্ত হয়ে রাগও হয়… ধুর আর যাব না বলে দাঁড়িয়েও পরেছি মাঝরাস্তায়… কিন্তু লেক এর কাছে পৌঁছানোর পর নিমেষের মধ্যে সব ক্লান্তি শেষ… মনে হয়েছে, হ্যাঁ এরকম কিছু দেখতে হলে এইটুকু কষ্ট করা করাই যায়… পাহাড়ী রাস্তায় ৫-৬ কিলোমিটার হাঁটাটাকে এইকুটু বলাই যায় লেক মাথেসান, টে আনু, মাভোরার মত লেক গুলোর সামনে দাঁড়িয়ে… নীল কাঁচের মত স্বচ্ছ জলে ছায়া পরেছে বরফে ঢাকা সাদা পাহারের… আর লেক ঘিরে দাঁড়িয়ে থাকা নানা গাছে ফুটে আছে বাহারী ফুল… এক টুকরো টলটলে রূপকথা…

কুইন্সটাউনের থেকে কিছুটা দূরে আছে লেক ওয়ানাকা… টে আনু তে রাত কাটিয়ে ওটাই আমাদের পরের গন্তব্য… একই রকম সুন্দর… তবে ঐ লেকের সৌন্দর্য বাড়িয়েছে লেকের জলের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা একলা গাছ… ফটোগ্রাফারদের খুব প্রিয় ঐ গাছ, নাম লোনলি ট্রি… সুর্যাস্তের সময় সোনালী আলোয় ঐ গাছ মনের মনখারাপের তারে আঙ্গুল ছুঁয়ে যাবেই তা সে যত শক্ত মানুষই হোক…

লোনলি ট্রি কে টাটা করে বেরিয়ে পরলাম পরের ডেস্টিনেশানে… গ্লেনোরকি… কুইন্সটাউনের আরেক জনপদ… গ্লেনোরকি ঢোকার মুখে সাইনবোর্ডে লেখা থাকে গ্লেনোরকি, ওয়েলকাম টু প্যারাডাইস… ওখানে গিয়ে বুঝেছি একটুও বাড়িয়ে বলা না… নীল রঙের লেকের পারের বালি সোনালি… লাল হলুদ রকমারি নুড়ি পাথর উঁকি দেয় ঝকঝকে জলের তলা থেকে… লেকের ঘন নীল জলে সোনালি রোদের ঝিকমিক, তার মাঝে মাঝে ভেসে থাকা সাদা পাল তোলা সেলিং বোট… সব মিলিয়ে চোখের সামনে বাস্তব স্বপ্ন রাজ্য…

এইবার আসি মূল কুইন্সটাউন শহরে… কুইন্সটাউন শহর কিন্তু বেশ শহুরে… বড় বড় রেস্তোরা… শপিং কমপ্লেক্স নিয়ে সাজানো শহর সেখানে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সাথে সাথে কমার্শিয়াল এন্টারটেইনমেন্টেরও সুব্যাবস্থা আছে… পাহাড়ের মাথায় আছে লুজ… কেবিল কার/ রোপওয়ে তে উঠে যাওয়া যায় সাড়ে চারশো মিটার  উঁচু পাহারের মাথায়… কেবিল কারে চড়ে ওতো  উঁচু থেকে রিমার্কেবলের কোলে নীল লেক ওয়াকাটিপুকে দেখা একটা খুব বড় অভিজ্ঞতা… একটা স্বল্প পরিচিত শব্দ এলো বোধহয় লেখায়ে… লুজ… আমার কাছে ওটা অপরিচিত শব্দ ছিল… এখানে এসে জানলাম লুজ এক ধরনের এডভেঞ্চার স্পোর্টস… গাড়ীর সদৃশ একটা ট্রলি, রীতিমত স্টিয়ারিং ব্রেক সমেত চলমান একটা খেলনা গাড়ী যা পাহাড়ী স্পাইরাল ট্র্যাকে চালিয়ে বাচ্চা বয়েসের আনন্দ ফিরে পাওয়ার দুর্লভ অভিজ্ঞতা পাওয়া যায়… লুজ ছাড়াও কুইন্সটাউনে রকমারি আনন্দের হরেক আয়োজন আছে… ক্যাসিনো থেকে শুরু করে হেলিকপ্টার রাইড পর্যন্ত…

কুইন্সটাউন শহরের বেশির ভাগটাই লেক আর আর পাহাড়… এক-এক লেক এর এক-এক রঙ এক-এক রকম গড়ন … আর পাহার গুলোও দিনের এক-এক সময় নিজেদের রঙ বদলে এক-এক রকম রূপ নেয়… যা দেখেছি তা সবটা লিখে বোঝাতে পারব না তবু চেস্টা করলাম… আমি মূলতমূল শহর থেকে দূরে মাভোরা, টে আনু, ওয়ানাকা এই লেক গুলোর ধারেই সময় কাটিয়েছি বেশি… নির্জন লেকে দেখা হয়ে গেছে সারা পৃথিবী থেকে আসা বিভিন্ন মানুষের সাথে… যারা বেশীর ভাগই ক্যাম্পেন করতে এসেছেন… ক্যারাভ্যান নিয়ে লেক-এর ধারে রাত কাটাতে… সমস্ত আরাম আয়েশ-এর জীবন ছেড়ে প্রকৃতির সাথে মিশে বন্য জীবন কাটানোর স্বাদ নিতে… কাঠের আগুনে সামান্য রান্না আর একটা ছোট্ট তাবু খাটিয়ে রাতের ঘুম… সারাদিন জলে-জঙ্গলের মধ্যে নিজেকে ভুলেইয়ে রাখার মত আনন্দ করার সাহস বোধহয় আমাদের তেমন নেই… অনেক কিছু শিখলাম দেখালাম আর অনেকটা ভালোলাগায় মন ভরিয়ে নিলাম…

 

 

 

Facebook Comments