তেল, নুন, সাবান, নানান প্রসাধনী,নরম পানীয় – বিজ্ঞাপনের ঘনঘটায় প্রাণ অস্থির। তথাকথিত বোকাবাক্সের রিমোট টেপাটেপি করে যতই আপনি এদিক ওদিক করেন সোনালী ও রুপোলী পর্দার নায়ক – নায়িকাদের হাসি মুখ আপনাকে দেখতেই হবে। সেই কবে এক কবি বলে গিয়েছিলেন – ‘মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে’। যা আজ এক প্রকান্ড বাস্তব। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথও তেল – সাবানের এই অমোঘ বিজ্ঞাপনী মাধুর্যের অঙ্গ হয়েছিলেন বহু আগেই। সংগৃহীত বহু বিজ্ঞাপনে রবীন্দ্রনাথের স্বহস্তে লিখিত প্রশস্তি বাক্যের আল্পনা মুগ্ধ করে। 
রবীন্দ্রনাথ নাকি কাউকে ফেরাতেন না। এমনটাই শোনা যায় বহু রবীন্দ্র ঘনিষ্ঠের ধারা বিবরণিতে। আর বিংশ শতকের শুরুর দিকটা বঙ্গদেশে বেশ অন্যরকম। বিদেশী দ্রব্য বর্জনের হিড়িক চারদিকে। হিড়িক কতটা যুক্তিহীন হুজুগেও পরিণত অনেকসময়ে। রবীন্দ্রনাথ যে সে হুজুগ এর পক্ষপাতী খুব একটা ছিলেন না তা বহু প্রবন্ধেই তিনি উল্লেখ করেছেন। আবার পাশাপাশি স্বদেশী শিল্পোদ্যোগও রবীন্দ্রনাথের সস্নেহ আস্কারায় সমৃদ্ধ। আবার তথাকথিত বিদেশী ব্র্যান্ডও কখনও কখনও রবীন্দ্র স্পর্শে বিজ্ঞাপন আর্কাইভে অমরত্ম পেয়েছে। 
আমাদের প্রথম আলোচ্য ১৩৪৪ সালের ২৩ শে বৈশাখের দীপালি তে প্রকাশিত বোর্ন – ভিটার বিজ্ঞাপন। বিজ্ঞাপনে স্পষ্ট করে লেখা – ‘ বোর্ন – ভিল এ ক্যাডবেরী কোম্পানী তৈরী করেছেন’। সাথে রবীন্দ্রনাথের ছবি এবং শান্তিনিকেতনের উত্তরায়নের প্যাডে লেখা – “বোর্ন – ভিটা সেবনে উপকার পাইয়াছি।” – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। মুক্তোর অক্ষরে রবিচ্ছটা। যেখানেই থামেনি বিজ্ঞাপনদাতারা। ছোট ছোট অক্ষরে লিখেছেন – ” বোর্ন – ভিটা সেবনে উপকার পেয়েছে হাজার হাজার লোক। তা’র ওপর বিশ্বকবির এই বাণী – বোর্ন – ভিটার স্বাস্থ্যপ্রদ শক্তির সমর্থন করায় সে শক্তির ভিত্তি হলো দৃঢ়তর।” রীতিমত বিদেশী কোম্পানির ব্রান্ডিংএ রবিবাবুর উজ্জ্বল উপস্থিতি। তাও যে সে কোম্পানী নয় খোদ ক্যাডবেরি। পরবর্তীকালে চকোলেটের সাথে সাথে যে কোম্পানীর নাম মাইল মিশে গেছে। আজও চকোলেটকে ক্যাডবেরিই বলেন অনেকে। 
এখন যেমন দেশজুড়ে স্টার্ট আপের ধুম। বঙ্গদেশে তখন মানে বিংশ শতকের শুরুর দিকে তেমনটা হয়েছিল। দেশীয় উদ্যোগের ছড়াছড়ি। এই উদ্যোগপতিদের অন্যতম ছিলেন হেমেন্দ্র মোহন বোস। নিজেকে বলতেন এইচ বোস। দেশীয় ভাবনার সাথে নিজের প্রতিভার মিশেলে একের পর এক চমক দিয়েছেন। কখনও টকিং মেশিন, তো কখনও নানাবিধ প্রসাধন। ব্র্যান্ডিং এর ব্যাপারটা ভালোই বুঝতেন হেমেনবাবু। এখন যেমন কোম্পানিরা ব্র্যান্ডিং এর জন্য ইভেন্ট, প্রাইজ এইসবের আয়োজন করেন। হেমেনবাবু তার কুন্তলীন তেলের প্রচারে কুন্তলীন পুরষ্কার দেওয়া শুরু করেন। 
১৯৩৬ সালে সেই কুন্তলীন পুরষ্কার সংক্রান্ত কোনও প্রকাশনায় একটি বিজ্ঞাপনে রবীন্দ্রনাথকে পাওয়া যায়। রবীন্দ্রনাথের একটি স্কেচের নীচে লেখা – “কুন্তলীন তৈল আমরা দুই মাস কাল পরীক্ষা কোরিয়া দেখিয়াছি। আমার কোন আত্মীয়ের বহুদিন ব্যবহার করিয়া একমাসের মধ্যে তাঁহার নূতন কেশোদ্গম হইয়াছে। এই তৈল সুবাসিত, এবং ব্যবহার করিলে ইহার গন্ধ ক্রমে দুর্গন্ধে পরিণত হয় না।” স্বা : শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। 
‘পূর্বাশা’ রবীন্দ্রস্মৃতি সংখ্যা,১৩৪৮ এ এস.সি.রায় এন্ড কোম্পানীর বিজ্ঞাপনে রবীন্দ্র কোটেশনের ছড়াছড়ি। একাধিক রবীন্দ্র কবিতার উপস্থিতি আছে এই বিজ্ঞাপনে। 
রবীন্দ্রনাথের ছোট একটা ছবি। ছবির নীচে লেখা – “বহুকালাবধি ডাঃ উমেশচন্দ্র রায়ের আবিষ্কৃত – উন্মাদ রোগে অমোঘ ফলপ্রদ ও আরোগ্যকর ঔষধটির বিষয় আমি বিশেষরূপে অবগত আছি।” শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। 
রবীন্দ্র শতবর্ষে ও বিজ্ঞাপন থেকে রবীন্দ্রনাথের নিস্তার মেলেনি। গল্পভারতী,রবীন্দ্রজন্মশতবার্ষিকী সংখ্যা, বৈশাখ ১৩৬৮। বিজ্ঞাপন দিয়েছেন ডোয়ার্কিন এন্ড সন প্রাইভেট লিঃ। বিজ্ঞাপনে রবীন্দ্রনাথের স্বহস্তে লিখিত একটি চিঠি। 
মহাশয়েষু –
আপনাদের ডোয়ার্কিন ফ্লুট পরীক্ষা করিয়া বিশেষ সন্তোষ লাভ করিয়াছি। ইহার হাপর অতি সহজে চালান যায় – ইহার সুর প্রবল এবং সুমিষ্ট। ইহাতে অল্পের মধ্যে সকল প্রকার সুবিধাই আছে। দেশীয় সঙ্গীতের পক্ষে আপনাদের এই যন্ত্র বিশেষ উপযোগী তাহাতে সন্দেহ নাই। আমি এই যন্ত্র ক্রয় করিতে ইচ্ছা করি। আমাকে ইহার মূল্য লিখিয়া পাঠাইবেন। 
– শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
চিঠির নীচে বিজ্ঞাপনদাতার সংযোজন – 
আমাদের বাদ্যযন্ত্রের সুরধ্বনি বিশ্বপুজ্য রবীন্দ্রনাথের আশীর্ব্বচনের মত চিরদিন দেশবাসীর হৃদয় তন্ত্রে ধ্বনিত হউক। 
মানস বন্দ্যোপাধ্যায়

মানস বন্দ্যোপাধ্যায়

প্রধান সম্পাদক , আসমানিয়া

প্রথম জীবনে নিউজ চ্যানেলের ক্রাইম রিপোর্টার। পরবর্তীতে আসমানিয়ার প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক। দীর্ঘদিন ধরেই লেখালিখি করেন বিভিন্ন পত্র পত্রিকায়।

Facebook Comments