#দুর্গা_দুর্গতিনাশিনী
#বন্দিতা_ভৌমিক
“সাধারণ এক মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে অামি, বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান। যেমন আরো পাঁচটা মধ্যবিত্ত পরিবারে হয় কলেজ শেষ করবার সাথে সাথেই বাবা আমার বিয়ে দিতে উদ্যোগী হলেন কিন্তু নিজের পায়ে না দাঁড়িয়ে বিয়ে করতে রাজি হলাম না আমি। আমার এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছিল রাতুল তাই বাবা-মায়ের ইচ্ছের বিরুদ্ধে গিয়ে নিজের সিদ্ধান্তে অনড় রইলাম আমি। বেশ কয়েকটি ইন্টারভিউ দেবার পর অবশেষে একটি ক্লিয়ার করলাম আমি। কোম্পানির চেয়ারম্যান মিস্টার দিবাকর সেন যখন অভিনন্দন সহকারে তার হাতখানি বাড়িয়ে দিলেন আমার দিকে মুহুর্তমধ্যে তা ধরে ফেললাম আমি। আনন্দে এতটাই বিহ্বল ছিলাম যে বুঝতেই পারিনি দিবাকর সেনের আঙ্গুল আমার হাতের তালুতে আঁকিবুঁকি কাটছে।
          আজ এক মাস হল দিবাকর সেনের P.A. আমি। এই একমাসে দিবাকর সেন সম্পর্কে অনেক কথাই কানে এসেছে আমার। যেমন জানতে পেরেছি তার স্ত্রীর আত্মহত্যার কথা তেমনি জানতে পেরেছি এই আত্মহত্যার পেছনে কারণ দিবাকর সেনের বহু নারীসঙ্গ। অবাক হইনি কারণ ইতিমধ্যেই আমার বস আকারে ইঙ্গিতে আমাকে বুঝিয়ে দিয়েছে যে চাকরিটা রাখতে গেলে তাকে খুশি করতেই হবে। মনটা ঘৃণায় ভরে গিয়েছিল। নিজের পাওয়ার ও পোজিসনের জোরে আর কতদিন দিবাকর সেনের মতো লোকেরা মেয়েদের খেলার পুতুল মনে করবে ? অজান্তেই বিদ্রোহ করে উঠেছিল আমার মন। সেই বিদ্রোহের আগুনে ঘি পড়ল একদিন যখন আমার বস ছুটির পর আমাকে তার চেম্বারে ডেকে পাঠালেন। আমি তখনও তার উদ্দেশ্য জানতাম না কিন্তু তিনি যখন নিল্লর্জের মতো জিজ্ঞাসা করলেন যে আমি তার প্রস্তবে রাজি কিনা তখন মাথা থেকে পা পর্যন্ত রাগে জ্বলে উঠেছিল আমার। হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে সপাটে এক চড় কষিয়ে দিলাম দিবাকর সেনের গালে। নিজেকে সেই মুহুর্তে প্রচণ্ড শক্তিশালী মনে হলেও ভুল ভাঙ্গল পরমুহুর্তে। দিবাকর সেনের চোখদুটো হিংস্র ভাবে জ্বলে উঠল এবং তার ভেতরের ঘুমন্ত শ্বাপদটা মুহুর্তমধ্যে বের হয়ে এল। তারপর যা ঘটল তার জন্য মোটেই প্রস্তুত ছিলাম না আমি, নিজের অহং বোধকে পরিতৃপ্ত করবার জন্য সে তার পুরুষত্বকে নির্দয় ভাবে জাহির করল আমার উপর। শুধু আমার শরীর নয় আমার মন, আমার আত্মা সবকিছুকে মুহুর্তমধ্যে ক্ষতবিক্ষত করে দিল সে। আমার নারীত্বকে পায়ের তলায় নির্দয়ভাবে পিষে সে আমার ক্ষতবিক্ষত ও রক্তাক্ত দেহটাকে রাস্তার একপাশে ঝোপের মধ্যে ফেলে দেয় মরবার জন্য। অসহ্য যন্ত্রণা ও ব্যাথায় কাতর শরীর নিয়ে কোনমতে বাড়ি ফিরে বাবা-মায়ের সামনে কান্নায় ভেঙে পড়ি আমি, সব হারানোর কান্না। সব কিছু শুনে স্তব্ধ হয়ে যায় তারা, আমার এই অবস্হাকে নিয়তি বলে মেনে নিতে বলে তারা। কিন্তু আমি আমার নারীত্বের এই চরম অপমানকে নিয়তি বলে মেনে নিতে রাজি ছিলাম না কিছুতেই, বরং আমার এই অপমানের জন্য যে দায়ী তাকে শাস্তি দিতে বদ্ধপরিকর হলাম আমি।
        দিবাকর সেনের বিরুদ্ধে কেস ফাইল করলাম আমি কিন্তু এর ফলে সমাজের কাছে উল্টো আমাকেই হেনস্তা হতে হল। সবাই সবকিছুর জন্য আমাকেই দায়ী করল, হাসি ও ব্যঙ্গবিদ্রূপের খোরাক হয়ে উঠলাম ক্রমশ লোকের চোখে। পরিচিত পুরুষদের চোখে নিজের জন্য লালসা দেখে অবাক হয়ে গেলাম আমি। বাবা-মা আমাকে বললেন চুপচাপ কেসটা ফিরিয়ে নেবার কথা কারণ আমার হারানো সম্মান আর কোনোদিন ও ফিরে পাবোনা আমি উপরন্তু সমাজে আমার বদনাম ছড়িয়ে যাবে আরও অনেক দূরে। বাবা-মায়ের মুখ থেকে এই কথা শুনে কোথাও যেন আমার বিশ্বাস একটু টলমল করে উঠেছিল। কিন্তু আমার বিশ্বাসে সবচেয়ে বড় আঘাত হানল রাতুল। আমি আমার নারীত্ব, আমার সতীত্ব সব হারিয়েছি, আমি আর ওর যোগ্য নই। এই কথাগুলো বলে রাতুল যখন আমাকে পুরোপুরি নিঃস্ব করে দিয়ে চলে গেল তখন বুঝলাম যে এই সমাজ কতটা নিষ্ঠুর এবং একচোখা। এখানে নারীর সতীত্ব বিচার করা হয় তার দেহ দিয়ে তার মন দিয়ে নয় ! এই সমাজ ও সমাজের মানুষরা হল এক একজন মুখোশধারী, যারা নারীদের উন্নতি ও প্রগতির কথা শুধুমাত্র মুখে বলে কিন্তু আসলে তারা সেই সব নির্যাতিতা নারীদের আরো বেশী করে শোষণ করে থাকে। মন্দিরে অধিষ্ঠিত দেবীকে রেশমী কাপড় পরায় আর বাইরে রক্তমাংসের নারীকে বিবস্ত্র করে এরা। “ধর্ষন”– খুনের চাইতেও বড় এক ঘৃণ্য অপরাধ। কারণ একজন ধর্ষিতা নারী শারীরিক ভাবে একবার ধর্ষিত হয় মাত্র কিন্তু এই নিষ্ঠুর সমাজ প্রতিনিয়ত তাকে মানসিক ভাবে ধর্ষণ করতেই থাকে।
        একসময় মনে হল মৃত্যুই শ্রেয়। কারণ এই সমাজের কাছে প্রতিনিয়ত হেনস্তা হতে হতে আমি ক্লান্ত, পর্যুদস্ত। তাই নিরুপায় হয়ে মৃত্যুবরণ করতে চেয়েছিলাম আমি। কিন্তু না, মৃত্যুকে আলিঙ্গন করা হয়ে উঠল না আমার কারণ জানতে পারলাম যে আমি আর একা নই, এক নুতন জীবনের সম্ভাবনা ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পাচ্ছে আমার ভিতরে। যে আমার নারীত্বকে চরম অপমান করেছে তারই অংশ রয়েছে আমার ভিতরে এবং আমাকে বাঁচতে হবে এই নুতন জীবনের জন্য যা আমারই রক্তমাংসে সৃষ্ট। দশমীর সেই রাতে মা দুর্গা যখন বিসর্জন  যায় তখন এক নুতন জীবনের বোধনের জন্য বদ্ধপরিকর হই আমি। আবার নুতন ভাবে লড়াই করবার  জন্য পুনরায় উদ্বুদ্ধ হই আমি। আমি শুধু একজন সাধারণ নারী নই, আমি দুর্গা– দুর্গতিনাশিনী।
         যথাসময়ে আমার কেস কোর্টে উঠল, শুরু হল আমার লড়াই। বিরোধী পক্ষের উকিলের বিভিন্ন আপত্তিকর ও কুরুচিপুর্ন মন্তব্য ছুটে আসতে লাগল আমার উদ্দেশ্যে। তিনি কোর্টে আমার চরিত্র বিশ্লেষণ করে প্রমাণ করবার চেষ্টা করলেন যে দিবাকর সেন সম্পূর্ণ নির্দোষ, আমি কিছু টাকার জন্য তাকে ব্ল্যাকমেইল করছি মাত্র। অবাক হয়নি এই অভিযোগ শুনে, কারণ যে সমাজ আমাকে প্রতিনিয়ত মানসিক ভাবে ধর্ষণ করে গিয়েছে তার কাছ থেকে এর বেশী আর কি আশা করতে পারি আমি ! কিন্তু না, আর কোনোভাবেই  আমার মনের জোরকে নাড়াতে পারেনি ওরা কারণ কোর্টে সেদিন সবার সামনে শুধুমাত্র এক লাঞ্ছিত, শোষিত ও পরাজিত মেয়ে দাঁড়িয়ে ছিলনা, ছিল নিজের মনের জোরে লড়াইয়ে নামা এক নারী যার নবজন্ম হয়েছিল মাত্র। সেদিন শুধুমাত্র মনের জোরকে সম্বল করেই নিজের সম্মানের লড়াই লড়েছি আমি। পুরো দুনিয়ার সামনে টেনে খুলে দিয়েছি দিবাকর সেনের মতো এক জানোয়ারের মুখোশ।
আদালত তার রায় জানালো শেষমেষ। দিবাকর সেনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের আদেশ দেয় আদালত। অজান্তেই গাল বেয়ে একফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল আমার। শেষ পর্যন্ত লড়ে জিততে পেরেছি আমি, এই জয় ন্যায়ের।
        যদিও এরপরেও এই সমাজ আমাকে মেনে নেবেনা আমি জানি কিন্তু তাতে আমার আর কিছু যায় আসেনা। কারণ আজ আমি আর একা নই, আমার বেঁচে থাকার উদ্দেশ্য রয়েছে আমার ভেতরেই, একটু একটু করে বেড়ে উঠছে সে প্রতিনিয়ত। সেইটুকুকে সম্বল করে আমি চলে আসি এক নুতন শহরে কিছু অচেনা মানুষের ভীড়ে আবার নুতন করে বাঁচবার জন্য। যদিও এই পথ চলা খুব একটা মসৃণ ছিলনা কিন্তু তা সম্ভব করেছি নিজের মনের জোরে। নির্দিষ্ট সময়ের আমি জন্ম দেই এক পুত্রসন্তানের যে আমার জীবনে এক নুতন আশার আলো হয়ে এসেছে। মাঝে মাঝে আমার মন তাকে নিয়ে তীব্র আশঙ্কায় পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে যে সে যেন তার জন্মদাতার ন্যায় এক নরপশুতে পরিণত না হয়, যে জীবন্ত মানুষকে ছিন্নভিন্ন করে রাস্তায় ফেলে দেয় মরবার জন্য। কিন্তু পরমুহুর্তে মনকে শক্ত করি এই ভেবে যে এই সন্তান আমার, আমার একার এবং একে মানুষ তৈরি করবার লড়াইটাও এখনো বাকি। আমাকে শক্ত হতে হবে এই শিশুর জন্য কারণ এই সমাজ দুর্বলদের জন্য নয়, এখানে বেঁচে থাকবার জন্য প্রতিনিয়ত লড়াই করে যেতে হবে এবং আমার লড়াই এখনো শেষ হয়নি শুরু হল মাত্র।”
         মায়ের ডায়েরীর পাতাগুলো পড়তে পড়তে দুচোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ল তার। সে ঘৃণা বোধ করল না যে সে কারোর লালসার ফল বরং সে গর্ববোধ করল যে সে তার মায়ের সন্তান। মায়ের এই অদম্য সাহস, প্রবল মানসিক শক্তি এবং সর্বোপরি অন্যায় এর বিরুদ্ধে লড়াই করবার প্রচেষ্টা অবাক করল তাকে। দেওয়ালে টাঙ্গানো মায়ের ছবির দিকে তাকিয়ে চোখের জল মুছল সে। অবশেষে তার মায়ের লড়াই সফল হয়েছে, তাকে মানুষের মত মানুষ বানানোর লড়াই। আজ সে একজন Public Prosecutor, যার জীবনের প্রধান লক্ষ হল সমাজের লাঞ্ছিত ও শোষিত মেয়েদের জন্য লড়াই।
বন্দিতা ভৌমিক

বন্দিতা ভৌমিক

বেশ কিছুদিন ধরে সৃজনশীল লেখালিখির সাথে যুক্ত। আসমানীয়ার হয়ে লেখালিখি এই প্রথম।

Facebook Comments