“গাবলু দাঁড়া যাবিনা। কী দুষ্টু রে বাবা তুই! দুপুর    ১.৩০টা বেজে গেলো । এখনও ঘুমোলিনা।” কথাগুলো এক নিঃশ্বাসে বলে গেল মিমি। আর ওদিকে বছর তিনেকের গাবলু কথাগুলো শুনে খিলখিল করে হেসে উঠলো । আধো আধো গলায় বলে উঠল, “তাহলে আজকে তোমার আর স্নান করা হবেনা।” কথাটা শুনে রাগতে গিয়েও হেসে ফেলল গাবলুর মিষ্টি। হ্যাঁ পিসিকে এই নামেই ডাকে সে। ঠিক তখনই মিমির বৌরাণী এসে গাবলুকে নিয়ে গেল। আর মৃদু ধমক দিয়ে মিমিকে বলে গেল, “এই জন্যই বলি যখন আমি গাবলুকে স্নান করাই তখন তুমিও স্নানটা সেরে নিও। তাহলে তো আর এতো বেলা হয়না।” মৃদু হাসলো মিমি। কীকরে বোঝাবে যে গাবলু যে বায়না করে, “মিত্তি আমার স্নানের সময় তুমি বাথ রুমের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকবে।” তার এই ছোট্ট আবদার ফেলতে পারেনা মিমি।
যাইহোক, মায়ের সঙ্গে গাবলু শুতে যাওয়ার পর মিমি এলো নিজের ঘরে। এই সময়টা তার নিজের। ছোটবেলা থেকেই অনেককিছু ভাবনাচিন্তা করে মিমি। আর এখন ওর ভাবনায় শুধুই গাবলু। আজ তার ছুটির দিন। মানে আজ সারাদিন গাবলু আর ও একসাথে।
হঠাৎ চিন্তায় ছেদ পড়ল দরজায় টোকা শুনে। মা খেতে দিয়ে ডাকতে এসেছে। বাবার বকুনিও যেন শুনতে পেল।  সত্যি অনেক বেলা হয়ে গেছে । নাহ্ আর ভাবনাচিন্তা করলে চলবেনা। কোনোরকমে সাড়া দিয়ে তাড়াতাড়ি এ্যাটাচড্ বাথরুমের শাওয়ারের তলায় এসে দাঁড়ালো। হঠাৎ মনে পড়ল সেদিন অফিসের নৈঋতা দি বলেছিল, “নিজে বিয়ে কর। নিজের সন্তান, সংসার হলে ও’সব দাদার ছেলে পরের ছেলে হয়ে যাবে।” কিছু বলতে পারেনি মিমি। শুধু এক অজানা আশঙ্কায় বুকটা কেঁপে উঠেছিল।
আজ মিমির বিয়ে। তার দশ বছরের ভালোবাসা পরিনতি পেতে চলেছে আজ। কিন্তু মনের ভিতরটা বড্ড ফাঁকা লাগছে। খালি ভাবছে কাল সকাল থেকে গাবলু কী করবে! যদিও সেই নিস্পাপ ছেলেটা নিজের মনে খেলে বেড়াচ্ছে। আর মাঝেমধ্যেই মিষ্টির কোলে এসে মিষ্টির সাজ দেখে যাচ্ছে। তবে ঈশ্বরের আশীর্বাদে মিমির বিয়ের পরেও গাবলুর সঙ্গে তার সখ্যতা এতটুকু কমেনি।
যথাসময়ে মিমিও সন্তানসম্ভবা হল। প্রথমেই চিন্তা হয়েছিলো “মেনে নেবে তো গাবলু?” এই আশঙ্কার কথা মিমি জানিয়েছিল তার এক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ দিদিকে। উত্তরে সেই দিদি বলেছিল, “এবার নিজেরটা দেখ। ওকে দেখার জন্য ওর বাবা-মা আছে।” তা ঠিক। গাবলুর বাবা-মা’র থেকে তো আর ও বড় নয়। কিন্তু তাই বলে ওর জন্য চিন্তা করাও মিমি ছাড়তে পারবে না। মিমি আর কথা বাড়ালোন। বোঝানোর বৃথা চেষ্টা করলনা যে মিমির ‘নিজের’ গন্ডিটা গাবলুকে ছাড়া অসম্পূর্ণ । আসলে ও যে গাবলুকে নিজের সন্তান ছাড়া অন্যকিছু ভাবতে পারেনা। যদিও গাবলু এই খবরে খুবই খুশি হয়েছিলো। সে অধীর আগ্রহে দিন গুনছিল তার ভাই বা বোনের জন্য।
যথাসময়ে আর একটি পুত্র সন্তানের মা হল মিমি। আজ সে ভাবে অনেকে তাকে বলেছিল, “নিজের সন্তান হলে ও’সব টান আর থাকেনা।” আজ মিমি জোর গলায় বলতে পারে, “আমার আছে। দুজনেই আমার সন্তান। গাবলু আমার আত্মজ।” তাই শুনে শতাব্দী বলেছিল, “তাহলে তুই কী বলতে চাইছিস যে ওর মায়ের থেকে তুই ওর বেশী ভালো চাস?” না, এ’কথা মিমি কখনোই বলেনা। এই কথাটা ভাবাটাই ধৃষ্টতা।
কিন্তু তাই বলে মিমির অনুভূতিও মিথ্যে নয়। নাহলে কেনই বা মিমির সন্তানের কথা উঠলে দুটো মুখই সামনে ভেসে ওঠে? কেনই বা সব আলোচনায়, সব কথায় দু’জনের কথাই বলে ফেলে? মিমি বোঝে অনেকের কাছে হয়তো এটা বাড়াবাড়ি লাগে কিন্তু মিমি আর কাউকে কোনো ব্যখ্যা দিতে যায়না। এতদিনে ও বুঝে গেছে যে ওর এই অনুভূতিটা কেউ বুঝবেনা। তবে হ্যাঁ যিনি বোঝার তিনি বুঝেছেন। আর সবার অলক্খে প্রশ্রয় দিয়ে গেছেন। আজ তাই তারই আশীর্বাদে দুই ভাইয়ের এতো টান। ভাইয়ের প্রতি গাবলুর এতো যত্ন, ভাইয়ের বিছানা করে দেওয়া, জামাকাপড় গুছিয়ে দেওয়া এগুলো কী সেই অর্থ বয়ে আনেনা? অন্যদিকে মামাবাড়িতে গেলেই ভাইয়ের দাদাভাইকে আঁকড়ে থাকা, ওইটুকু বছরখানেকের ছেলের দাদাভাইয়ের ছবি দেখে জড়িয়ে ধরা কী কিছু ইঙ্গিত দেয় না! মিমি আজ ভাবে তার দ্বিতীয়বারের মা হওয়ার অনুভূতি তো প্রথমবারের থেকে কোনো অংশে আলাদা ছিলোনা। নাই বা মানল কেউ। কিন্তু ও তো জানে যে সে দুই সন্তানের গর্বিতা মা।
সঞ্চিতা দাস

সঞ্চিতা দাস

দীর্ঘদিন ধরে সাংবাদিকতা , সৃজনশীল লেখালিখির সাথে যুক্ত।  আসমানিয়া পত্রিকার সাথেও যোগাযোগ অনেকদিনের। আসমানিয়া ওয়েলফেয়ার সোসাইটির কার্যকরী সমিতির সন্মানীয় সদস্য।

Facebook Comments