এক জানুয়ারীর সন্ধ্যায় পাঁচ বন্ধু মিলে শেষমেশ চেপেই বসলাম কাঞ্চনকন্যা এক্সপ্রেসে। মাস চারেক আগে ঘারোয়া আড্ডায় ঠিক হয়েছিল উইকএন্ডট্যুর তো অনেক হল এবার হোক উত্তরবঙ্গ অভিযান , টু বি স্পেসিফিক ডুয়ার্স অভিযান , সকলেই তখন কলেজ শেষ করে চাকরিতে ঢুকেছি। বন্ধুদের কারোও কারোও ওদিকটা ঘোরা হলেও আমার প্রথম। ট্রেনে আড্ডা, গান, ডিম তরকারিতে একটা জমাটি সন্ধ্যা কাটল। ঘুম যখন ভাঙ্গল ট্রেন এন. জে; পি তে, ঘড়িতে সাড়ে সাতটা, মুখ টুখ ধুয়ে এসে জানলার পাসে বসতেই বুঝলাম পরিবেশ ও উত্তাপ দুটোই বদলেছে ট্রেন যত উত্তরগামী হল ঠাণ্ডা আর সবুজের পরিমান যেন তত বাড়তে থাকল। এন. জে. পি.ছাড়ার পর মনে রাখার মতন দুটো জিনিষ চোখে পরল।তিস্তার উপর দাড়িয়ে কারনেশন ব্রিজ -স্বাগত জানাচ্ছে টুরিস্টদের আর চালসা স্টেশন, দ্বিতীয়টি সাক্ষাৎ কোন শিল্পীর ক্যানভাস থেকে তুলে আনা, সাড়ে নটা নাগাত ট্রেন পৌছে গেল গন্তব্যে নিউ ম্যাল জংশন।

আমাদের প্রথম চারদিনের আস্তানা লাটা গুরি, গরুমারা অরণ্যে ঘেরা ছোট জনপদ।ভাড়ার গাড়িতে করে দশটার মধ্যে পৌঁছে গেলাম টাস্কারডেন রির্সটে। প্রথম দুপুরটা কাটল হালকা আলসেমিতে, রির্সটে শুনলাম আধ মাইল হাঁটলে মুরগির লড়াইয়ের আসর বসে। বিকেল বিকেল বেরিয়ে পরলাম মুরগী লড়াই দেখতে। গল্পে পড়েছি , সিনেমায় দেখেছি নিজের চোখে চাক্ষুস করা এক অভিজ্ঞতা বটে।সন্ধায় রিসটের তরফে বন ফায়ারের ব্যবস্তা করেছিল সঙ্গে স্থানীয় আদিবাসী দলের নাচের অনুষ্ঠান ।বেলা কাটল আমাদের ডুয়ার্সের প্রথমদিন। পরের দিন সকালে মিনিট পনেরো হেঁটে চোখে পড়ল এক রেললাইন, জঙ্গল চিরে ভিতরে ঢুকে গেছে।শুরু হল হাটা।পথে দেখা হল কিছু ঠিকাদারের লোকের সাথে ওরা লাইন সারাইের কাজ করেছে ওদের ফেলে এগিয়ে গেলাম। পেলাম ন্যাওড়া রিভার ব্রিজ, দূরে দেখলাম জনমানব হীন একপ্রান্তরে দাড়িয়ে ন্যাওড়া রির্সট। একটা সময় পেটের ছুঁচোগুলো জানান দিল ব্রেকফাস্টটাও হয়নি, অতঃপর ফেরার পথে ধরা, দুপুরের খাওয়া সেরে দুই বন্ধু বেরিয়ে গেল জঙ্গল সাফারির টিকিট কাটতে, ৩ টে নাগাত শুরু হল জঙ্গল সাফারি- হুটখোলা জিপে, কিছুদূরে অন্তর যেন জঙ্গলের রুপ বদলে যায়। কোথাও দোতলা সমান ঘন গাছের ঘনঘটা কোথাও আবার বন অপেক্ষাকৃত পাতলা। বাঁদরগুলোর দেখাতো আগেই পেয়েছিলাম এক জায়গাই পেলাম ময়ুরের দেখা। ক্যামেরা বন্দী করতে করতে পৌঁছে গেলাম নির্দিষ্ট সাল্ট পিটে। যেখানে জঙ্গলের প্রানীরা আসে নুন জল খেতে আর আমাদের মতন টুরিস্টরা আসে তাদের দেখতে, বেশ কিছু বাইসন আগে থেকে সেখানে ছিল। অনেকক্ষন তাকিয়ে থেকে মনে হল কি যেনো একটা নরে উঠল ঝোপের ভিতর থেকে, ধীরপদে বেড়িয়ে এলো একশৃঙ্গ গন্ডার। এতটাই ধীরপদে যে ওর পিঠে বসে থাকা সারস জাতীয় পাখিটাও ওড়ার প্রয়োজনীয়তা বোধ করলনা পর্যন্ত। প্রচুর ছবি তুলে ফিরে এলাম এক সময়। সেদিন সন্ধায় বেরলাম লাটাগুরির eks এক্সপোলার ,করতে। এ ধরনের ছোট জনপদের সুন্দর একটা নিজস্ব বর্ন, গন্ধ, রুপ থাকে। ছোট ছোট দোকান, ছোট ছোট আড্ডার জটলা, তারি মাঝে টুকটাক বিকিকিনি, পরের দিনের বিন্দু যাওয়ার গাড়িটা ঠিক হল ওখান থেকে।

পরের দিনটা ছিল রির্জাভ অর্থাৎ কোন আগাম প্লান ছিলনা। কিন্তূ পাঁচটা ব্যাচেলার ছেলে এক জায়গায় থাকলে হুজুগ উঠতে কতক্ষন! ঠিক হল লাভা যাব। শুনলাম অন্য রুট তবুও যাব- উঠল বাই তো লাভা যাই। এদিককার উচ্চতা আরো বেশী। পাকদন্ডি বেয়ে উপরে ওঠা, পাহাড় বেয়ে মেঘ নামা মনের ভিতর তখন বাড়ছে ‘মেঘ পিয়নের ব্যাগের ভিতর মন খারাপের দিস্তা।‘ লাভা যখন পৌঁছলাম সেখানকার তাপমাত্রা তিন কি চার। সোয়েটারের উপর জ্যাকেট চাপিয়ে নেমে পরলাম, অসাধারন মনেস্ট্রি । কখনো মেঘ এসে চত্বরটাকে ডেকে দিচ্ছে কখনো আবার মেঘ কেটে ঝলমলে হয়ে উঠছে চারিদিক। এক কিউরিও সপ কাম রেস্টুরেন্ট কাম গৃহস্থের বাড়ীতে লাঞ্চ সেরে লাটাগুরির উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। ফেরার পথে শেষ বিকেলের আলো মেখে খানিকটা সময় কাটল মুর্তী নদীর নির্জনতায়। সেদিন ছিল লাটাগুরিতে আমাদের শেষ রাত্রি বাস। পরের রাত্রি তথা ট্যুরের শেষ রাত্রি কাটানোর আস্তানা হিসেবে ঠিক ছিল সুনতালে খোলার বনদপ্তরের কটেজ। লাঞ্চটা তাড়াতাড়ি সেরে পরের দিন বেরিয়ে পড়লাম সুনতালে খোলার উদ্দেশ্যে। দুপুরে এসে পৌছালাম একটা সুন্দর পাহারী গ্রাম তথা টুরিস্ট ডেস্টিনেশন সামীসং-এ। এখানে কমলালেবুর চাষ হয়। যদিও শীতের শেষ তবু গাছে গাছে তখনও লেবু ঝুলে রয়েছে। কিছুক্ষণ কাটিয়ে এগোতে লাগলাম সুনতালে খোলার উদ্দ্যেশ্যে। একটাবাক ঘুরে দেখলাম আচমকা রাস্তা শেষ। একটা ছোট নদী তীর তীর করে বয়ে যাচ্ছে। একটা ঝুলন্ত ব্রিজ ওপারে চলে গেছে আর ওপারে দাড়িয়ে আছে একটা সুবিশাল পাহাড়। পাহাড়ের গায়ে সবুজ বনানী। পায়ে হাটার ঝুলন্ত ব্রিজ উলটো দিকের পাহাড়ের বনদপ্তরের কটেজগুলো ধাপে ধাপে উঠে গেছে উপরে। পুরো চত্বরটা জুড়ে রয়েছে পাহাড়ি ফুলের বাগান। মনে পড়ল ড্রাইভার দাদা আসার সময়ে মুচকি হেসে বলেছিল পরেরবার মধুচন্দ্রিমায় এসো। মনে মনে ওর রুচির তারিফ না করে পারলাম না। যেকোনো ট্যুরের শেষ রাতে মনটা একটু বিষণ্ণ হয়ে ওঠে প্রতিটা মুহূর্তকে আরও বেশী করে উপভোগ করতে চায়। খাওয়া দাওয়া গান বাজনা করে যখন শরীরটা বিছানায় এগিয়ে দিলাম অন্ধকার তখন ফিকে হতে শুরু করেছে। পরের দিন দুপুরে বেরিয়ে পড়লাম নিউ ম্যালের দিকে। পথে দেখে নিলাম রকি আইল্যান্ড। এবার কলকাতা ডাকছে কিন্তু মনের গোপনে চিরস্থায়ী স্মৃতি হয়ে রয়ে গেলো আমার প্রথম ডুয়ার্স যাত্রা।

 

 

সায়ন্তন সেনগুপ্ত

সায়ন্তন সেনগুপ্ত

আসমানিয়া পত্রিকার অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সায়ন্তন সেনগুপ্ত বহুদিন ধরে লেখালিখির সাথে যুক্ত। একাধিক পত্র পত্রিকায় তার লেখা উচ্চ প্রশংসা লাভ করেছে। পেশাগত জীবনের বাইরেও তার লেখালিখির পরিসর তাকে লেখালিখির জগতে নিজস্ব স্থান দিয়েছে।

Facebook Comments