ছোটবেলা থেকেই এই ফুলটার গন্ধ স্রোতের খুব প্রিয়। ফেব্রুয়ারির এই সময়টা যখন একটু একটু করে শীত কমে মন কেমনের বসন্ত জানলার পাল্লা খুলে দেয়।  স্রোত জীবনদীপের উল্টো পারের বাস স্ট্যান্ডটায়  এসে দাঁড়ালো। বিকেল নিভু নিভু। মায়াবী শহরটা নিয়ন আলোর ফুল সজ্জায় সেজে উঠছে রোজকার মতো। সারাটা দিনের ক্লান্তি সরিয়ে এ সময়ে আমাদের চেনা শহর বাড়ি ফেরে। কেউবা ধরে শহরতলীর পথ। স্রোত ঘড়িতে চোখ বোলালো। বাড়ি ফিরেই টিউশন বাড়ি যেতে হবে। গানের টিউশন। সপ্তাহে দুদিন। বাবা মারা যাবার পর ভাইয়ের পড়াশুনো , মায়ের চিকিৎসা , সাংসারিক খরচপাতি , এমনকি খুঁটিনাটি সব দায়িত্বই স্রোতকে একার হাতে নিতে হয়েছে। নব বসন্তের বিকেলটা স্রোতের ভালোই লাগছিলো। একটা মন খারাপ, মন খারাপ হাওয়া , বাউলেরা যাকে বলতেন বদ  হাওয়া। অজান্তেই সেদিন আমার অণু গল্পের নায়িকা গুন্ গুন্ করে গান গাইছিলেন – যদি প্রেম দিলে না প্রাণে। গানের কথা স্পষ্ট নয়, সুর সুস্পষ্ট। মনের কোন একটা হালকা অভিমান ও আসছিলো বটে। কলেজ , ইউনিভার্সিটি ঝড়ের মতো কেটে গেছে অনেকগুলো বসন্ত। স্রোত যার পুরো নাম স্রোতস্বিনী তার সবটুকু মন ও শরীর নিয়ে ভেসে যেতে চেয়েছে বসন্ত বাতাসে। বসন্ত কে চেয়ে চেয়ে সবাই দেখতে পারে , কিন্তু বসন্ত সবার দিকে তাকায়  না। স্রোতের জীবনে  মহাসমারোহে কিংবা নিঃশব্দ চয়নেও প্রেম আসে নি। হয়তো বা মৃদু স্বরে সে গান বেজে উঠতে চেয়েছে , কিন্তু জীবনতো  সব সময় কবিতা নয়। গদ্যের কড়া  হাতুড়ির শব্দে সব কবিতাই থেমে  গেছে।  মনের মধ্যে এ সব ভাবনাকে স্রোত কোনও দিন প্রশ্রয় দেয়  না। ভাবনাকে কড়া  শাসন করাই তার  রীতি। সেদিন কিন্তু ভাবনারা একটু প্রশ্রয়ই পাচ্ছিলো। আপনার গানের গলাটা খুব ভালো। গুনগুন করে গেয়ে চলা যে গানটা শোনা যাচ্ছিলো থেমে  গেলো। অচেনা গলা। পাশে এসে দাঁড়ানো ছেলেটির মুখটাও অচেনা। কিন্তু বাসস্ট্যান্ডে চেনা বাস এসে গেছে। গল্পটা এখানেই শেষ। বাকিটা ফাগুনের আগুন জানে।

 

চিত্রে – অয়ন্তিকা মজুমদার

চিত্রগ্রাহক – সঙ্ঘমিত্রা নাগ
সৌজন্যে – ষ্টুডিও টেরাকোটা
Facebook Comments