অনেকক্ষণ ধরে একটা মিষ্টি সুর ঘরের চার দেওয়ালে ধাক্কা খেয়ে একসময় থেমে গেল।মোবাইল বলছে মিসড কল অমৃতা।কাল অনেক রাত অবধি অনুভূতি গুলোকে ডাইরীতে নামানোর চেষ্টা হয়েছে, তাই হয়ত একটা আলস্য ঘিরে রেখেছে শ্রেয়াকে।

কিন্তু উঠতে তো হবেই নাহলে মা এখনি ডাকাডাকি শুরু করবে। সকালের এই সময়টা বাড়ীতে এমনিতেই ব্যস্ততা থাকে, শ্রেয়া কলেজ বের হয়, বাবা অফিসে।মা তাই এই সময়টা রান্নাঘরে ব্যস্ত থাকেন।তবু সকালের ব্রেকফাস্টটা একসাথে করা এ বাড়ীর রেওয়াজ।বাবা ডাইনিং টেবিলে বসে কাগজটায় চোখ বুলিয়ে নেন। আজ পেপারের সাথে একটা সাপ্লিমেন্টারি দিয়েছে, বোধহয় আজকের দিনটাকে নিয়েই হবে।

টেবিলের ওপরে পড়ে থাকলেও এবাড়ির কালচার অনুযায়ী বাবা মার সামনে শ্রেয়া তা পড়বে না। অনেক কিছুই ও করেনা যা ওর সমবয়সী বন্ধুরা করে থাকে।এ নিয়ে কলেজে কম প্যাক খেতে হয়নি। শত তাড়ার মধ্যেও স্নানঘরের মিনিট দশেক ওর নিজের জন্য তুলে রাখে।এইসময় ও দিনের শিডিউলটা নিজের মতন করে গুছিয়ে নেয়।যেমন আজ প্রথমে কলেজস্ট্রিটে একটা বই বদলাবে, তারপর কলেজ আর সব শেষে বি.কে. স্যারের কোচিং করে বাড়ী ফিরতে ফিরতে রাত আটটা।

শাওয়ারের জলটা শরীর ভেজাতেই আলস্যটা কেমন যেন আজ মন খারাপে বদলেগেল।অথবা ওটা শুরু থেকে মনখারাপই ছিল ওই হয়ত বুঝতে পারিনি।এমনিতে মনখারাপকে ও খুব ভই পায়, তবু যে কোথা থেকে ঈশান কোনে মেঘ জমে আর তারপর পুরো আকাশটার দখল নিয়ে নেয়। বাড়ী থেকে মিনিট দশেকের অটোয় ফারিটফোর স্ট্যান্ড, আজ কপাল ভালো তাই বাসে উঠে জালনার পাশে একটা সিট্ পেয়ে গেল।ইতিমধ্যে অমৃতা আরেকবার ফোন করেছিল , বলল কলেজের নাম করে সারা দিন ঋজুদার সাথে কাটাবে।এক মাসের আলাপেই ওরা অনেকটা এগিয়েছে।ঋজুদা যাদবপুরে আই.টি. ফোর্থ ইয়ার, ক্যাম্পাসিংএ সাত লাখের প্যাকেজ পেয়েছে।শ্রেয়ার সাথে অমৃতা দুদিন দেখা করিয়েছে। ছফুট হাইট, এখন সিক্সপ্যাকের জন্য জিম যাচ্ছে।ভি. আই. পি রোডে ধরে বাস যেমন ছুটে চলে ওর ভাবণাও সেগতিতে এগিয়ে চলে।

এমনিতে শ্রেয়ারা এখানে এসেছে বছর তিনেক হল। আগে ফুলবাগানে ভাড়াবাড়িতে থাকতো। অমৃতারা ওখানেই থাকে। ওদের বন্ধুত্বের প্রায় তেরো বছর হয়ে গেলো। ক্লাস ওয়ান থেকে, এক স্কুল এখন এক কলেজ। পড়াশুনোয়ে দুজন উনিশ বিশ। বিশটা অবশ্য শ্রেয়াই। এটাবাদ দিলে দুজনের মধ্যে মিল খুবই কম। অমৃতা অনেক বেশী বোল্ড, আউট স্পোকেন। অন্য দিকে শ্রেয়া অনেক নরম মনের মেয়ে। লোকে বলে এই অমিলটাই নাকি ওদের মিলের সবচেয়ে বড় কারন। তবে আজকাল একটা পার্থক্য ওকে বড্ড খোঁচা দেয়। অস্বীকার করে লাভ নেই অমৃতা সত্যই একটা ডানাকাটা পরী, আর শ্রেয়া নেহাতই সাধারণ। স্কুল থেকেই অমৃতাকে ঘিরে একটা বৃত্ত তৈরী হত। এতদিন তো শ্রেয়াও সেই বৃত্তেরই অংশ ছিল, তাহলে কলেজে এসে কি হল? ও কি ওর বেস্ট ফ্রেন্ডকে হিংসা করছে? ছিঃ ছিঃ কি সব ভাবছে ও। কলেজে ঢোকার মুখে দেখল অভীদা আর মৌ বেড়িয়ে যাচ্ছে, ওরা কলেজের হট কাপল। ঘড়ির কাটা দশটা কুড়ি ছুয়ে ফেলেছে, সাড়ে দশটায় ডি .জি. ম্যামের ক্লাস। শ্রেয়া পা চালাতে যাবে এসময়, এই, শ্রেয়া। সোহম হাঁফাতে হাঁফাতে এসে ডাকছে। আজ অমৃতা আসবেনা? না। ওর দিকে না তাকিয়েই শ্রেয়া উত্তর , ডি.জি. ম্যামের পড়ানো তো এমনিই বোঝে না আর আজ তো মনটা বড়ই বিক্ষিপ্ত। সোহমকে বোধহয় উত্তরটা আরেকটু ভালোভাবে দেওয়া যেত। আজ আর কারো ভালোলাগা খারাপ লাগার কথা ভাববেনা শ্রেয়া, ওর ভালোলাগা খারাপ লাগার খবর আজ পর্যন্ত কে রেখেছে? দুটো বেঞ্চ পেছনে মুখ চুন করে বসে আছে সোহম। ওই বা কি করবে . এমনিতে সোহমের সাথে ক্লাস এইট থেকেএক স্যারের কাছে অঙ্ক করে। সে অর্থে সোহম ওর প্রথম ছেলে বন্ধু। ইলেভেনে অমৃতাও ওই কোচিংটা জয়েন করে। তিনজনের বন্ধুত্বে সময় লাগেনি। পরে বুঝেছিল সোহম অমৃতাকে অন্য ভাবে চায়। যা কোনো দিন সম্ভব নয়। ছেলেটা ভালো, একটু বেশীই ভালো, যতটা ভালো হলে লোকে ক্যাবলা বলে। তবু সোহমের মুখ চেয়ে ও কথাটা অমৃতার কাছে একবার বলেছিল। অমৃতা হেসেছিল বলেছিল জানি তো। হাসিটা সবটা জানিয়ে দিয়েছিল। তখন অবশ্য অমৃতা পার্থর সাথে চুটিয়ে প্রেম করছে। আচ্ছা শ্রেয়া তো যেকোনো দিন অমৃতার চেয়ে বিশ্বস্ত সাথী হতে পারে। কিন্তু তবু কেন…… সব শালা একটা জিনিসই বোঝে, সে ঋজুদার মতন হাংকই হোক বা সোহমের মতন ক্যাবলা। অমৃতার শেষ এস.এম.এসে লিখেছে ওরা আইনক্সে কি একটা ভাটের বই দেখেছে। আসলে ওদের বোধহয় একটু অন্ধকারের একটু গোপনীয়তার প্রয়োজন। টিফিনটা সেরে শ্রেয়া আজ লাইব্রেরীতে চলে এল। ও একবার ভেবেছিল সোহমকে ঋজুদার কথা বলে দেবে। কিন্তু সোহম যা নরম মনের, যেদিন বুঝেছিল ওর ভালোবাসার মেয়েটার কাছে ওর মূল্য কতখানি খুব কেঁদেছিল। খুব রাগ হয়েছিল শ্রেয়ার ওকেও তো কেউ ভালবাসে না, ওর ও তো কান্না পায়। কিন্তু আজ পর্যন্ত কি ও নিজের ঘরের বাইরে কারো কাছে কেঁদেছে! আর সোহম একটা ছেলে হয়ে……। এই লাইব্রেরিতেও আজ সব জোড়ায় জোড়ায়। চারিদিকে যেন আদিখ্যেতার উৎসব চলছে। এতক্ষণের মন খারাপটা এবার বেশ রাগে পরিনত হচ্ছে। নাহ আর বেশিক্ষন কলেজে থাকা যাবেনা। বি.কে. স্যারের ক্লাস সাড়ে পাঁচটায় এখন সাড়ে তিনটে। শ্রেয়া হিসেব করে নিল এখন বেড়ালে ও একবার ঠাম্মির বাড়ী ঘুরে যেতে পারবে। কলেজে গেট থেকে বেড়তেই মোবাইলটা চেনা সুরে বেজে উঠল, সোহম কলিং। মনে পড়ল ক্লাসের পর সারাদিন ছেলেটার কোন পাত্তা ছিলনা। হ্যালো। একবার ক্লাসে আসবি? কিছু একটা বলতে গিয়েও শ্রেয়া থেমে গেল, গলাটা কেমন জানো ঠেকলো, তাই আনুরোধটা ফেলতে পারল না। ক্লাস রুমটা তিনতলায় এসময় এঘরে কোনো ক্লাস থাকেনা, ছেলেটা লাস্ট বেঞ্চে মাথা নিচু করে বসে আছে। এরকম ফাকা একটা ঘরে শুধু সোহমের সাথে কেমন একটা অস্বস্তি…তা থেকেই একটা বিরুক্তি বোধহয় গলায় এসেছিল, কি হয়েছে? ডাকলি কেন? টকটকে লাল দুটো চোখ নিয়ে সোহম মাথা তুলল। স্পষ্ট গাল বেয়ে যাওয়া জল দেখা গেল। কি হয়েছে? শ্রেয়ার গলা এবার বেশ নমনীয়।মোবাইলটা এগিয়ে দিল , একটা এস.এম.এস অমৃতা পাঠিয়াছে, উই হ্যাড আ গ্রেট টাইম টুগেদার, আজ ঋজু আমাকে ফাস্ট টাইম স্মুচ করল। পরে ডিটেলে বলব। কল ইউ লেটার ডিয়ার। তোকে পাঠাতে গেছিলো ভুল করে আমাকে পাঠিয়াছে, সরি বলার জন্য এস.এম.এস করেছে। সোহমের গলা কাঁপছে। আমি জানি আমি স্মার্ট নই, তাই বলে কি আমি কারু  ভালবাসা পেতে পারিনা।শ্রেয়ার হাত জড়িয়ে ছেলেটা রীতিমতো কাঁপছে। একটা মায়া বা স্নেহ বা ভালবাসা অথবা সব কটা মিলিয়ে কেমন অচেনা একটা অনুভূতি যেন শ্রেয়ার মনকে ছেয়ে ফেলেছে। নিজের হাত ছাড়িয়ে  ও সোহমের মাথায় রাখল। ছেলেটার মাথাও নেমে এল ওর কাঁধে।

শ্রেয়ার মোবাইল স্ক্রিনে আবার অমৃতা ডাকছে। নাহ ধরবে না, ও এমুহূর্তটা কারো সাথে ও ভাগ করবেনা, নিজের বেস্ট ফ্রেন্ডের সাথেও না, কে জানে হয়ত নতুন কোন গল্প লিখবে আজকের দিনটা।

ও আপনাদের আজকের তারিখটা তো বলা হয়নি। ডেটটা হল ১৪ই ফেব্রুয়ারী।

Facebook Comments