চোখটা জড়িয়ে  আসছিল অনেকক্ষন ধরে। এখনতো ল্যাম্পপোস্টর ২-৩ টি করে প্রতিবিম্ব দেখছি । সামনের রাস্তাটাও বীভৎস  ভাবে দুলছে।

সকালের রোদ চোখে পরে যখন ঘুম ভাঙল তখন সকাল ৯ টা সাড়ে ৯টা হবে। সুব্রতর ফ্লাটটা বেশ বড়োই  বলা চলে। হাতে পায়ে একটা  ম্যাজম্যাজে ভাব রয়েই গেছে। এক কাপ কফি নিয়ে সুব্রত ঘরে ঢুকলো। ‘এভাবে কেউ খায় , বাবা মা দেশের বাড়ি  গেছে বলে তোকে নিয়ে আসতে  পারলাম, আমি অফিস বেরচ্ছি। তুই যাওয়ার সময় চাবিটা সামনের ফ্লাটে দিয়ে যাস। সুব্রত, সুব্রত রায় কোনো দিনই আমার  খুব কাছের বন্ধু ছিলনা। কালরাতে মোবাইল স্পিড ডায়লে ৭ নম্বর বোতামটা টিপে ছিলাম অরুনকে  ফোন করার জন্য। অরুনের কাছে শূনেই সুব্রত আমার উদ্ধারকর্তা  হয়।

ফাঁকা  ফ্লাটে অনেকক্ষন অলস ভাবে বসে রইলাম। জানলা  দিয়ে রোদের অল্প উষ্ণতাকে গায়ে মাখতে বেশ ভাল লাগছিল। দূরে বাইপাসের উপর দিয়ে ছুটে যাওয়া গাড়ির সারি শহরের একটা ব্যস্ত  দিনের শুরু আঁকছে ।

মন বোধহয় একটানা কোন কিছুকেই বেশীক্ষণ পছন্দ করেনা। অতি দুঃখেও তাই কান্না এক সময় থেমে যায়। মন না কান্নার কারণ  খুঁজে  নেয়। একটা সময় বোধহয় নিজের ওপর করুণা আসে। কেন কাঁদবো আমি ? অন্তত  আমার মন হয় তাই বলেছিল।

ধীরে ধীরে মুখ চোখ ধুয়ে যখন ফ্লাট ছাড়বো ছাড়বো করছি মোবাইল ঝিলিক আমার  দিকে খুব মিষ্টি হেসে বলে উঠল ‘কি হলো ফোনটা ধর’। অনিমা  কাকিমার ফোন, তাই ধরার কোন প্রশ্নই নেই। যেদিন ঝিলিকের এই ছবিটা তুলে ছিলাম সেদিন ব্ল্যাক টপ আর নেভি ব্লু জিনসে ওকে ভারী মিষ্টি  দেখাচ্ছিল সেদিন ভয়েস রের্কডার ওর  গলায় ‘কি হলো ফোনটা ধর’ রের্কড করছিলাম……… তাও প্রায় মাস পাঁচেক হল।

বাসে ফিরলে বাড়ি  মিনিট পনেরো আর ভেতর দিয়ে হেঁটে  গেলে মিনিট পঁচিশ। আমি দ্বিতীয়টা বাছলাম। চারদিকে তাকালেই বোঝা যায় বসন্ত আসছে  । কালেজ মোড়ের কাছে অতনুর সাথে দেখা, অতনু  কলেজের ক্লাসমেট। এড়িয়ে যেতে  চেয়েছিলাম কিন্তু পারলাম না। ‘ঝিলিক কেমন আছে?’ ‘আমাদের কাল ব্রেক আপ হয়ে গেছে।’ হতভম্ব অতনুকে  পিছনে ফেলে এগিয়ে এলাম। বাদিকে সুবলদার রেস্টুরেন্ট পরে। সকালের ফাঁকা  টেবিল চেয়ার গুলো যেন আমার দিকে চেয়ে হাসছে। বিশেষ করে কোনারটা।

মা জানত অরুনের  বাড়ি রাতে ছিলাম তাই মাকে নিয়ে সমস্যা নেই। কিন্তু মাথাটা গরম হল অনিমা  কাকিমাকে দেখে। একগাল হেসে বললেন, ‘বাবা তুমি এই বাড়ি এলে, বলতে খারাপ লাগছে, একবার বিকালে আমাদের বাড়ি আসবে। জানইতো কাল রাত্রির অঙ্কের টেস্ট।‘ আমি খুব খারাপ অবস্থাতেও  লোকের সাথে  খারাপ ব্যবহার করতে পারিনা তাই বিরক্তিকে যথা সম্ভব চেপে রেখে ঘাড় নাড়িয়ে অন্য ঘরে  চলে গেলাম। ভদ্র মহিলা যে কি চান টা কেবল উনিই  জানেন। ওনার মেয়ে ক্লাস ফাইভ থেকে স্কুলে ফার্স্ট । এখন ইলেভেন। এলাকার অঙ্কের টিউটার হিসেবে কিছুটা নাম হওয়াতে উনিই  আমার কাছে আসেন। আধঘন্টার ইন্টারভিউয়ের পর টিউশনিটা পাকা হয়। হ্যাঁ, আমার টাকার দরকার ছিল তাই এত সব সহ্য করা।

দুপুরে সেরকম খেলাম না তাই দেখেই বোধহয় মায়ের সন্দেহ  হয়। ‘শরীর কেমন আছে? খেলি না কেন?’ প্রভৃতি নিরামিশ প্রশ্নের পর এলে সেই ব্রক্ষাস্ত্রটি, ‘ঝিলিক অনেকদিন আসেনা কেন?’ মাকে আমি কোনোদিনই  ঝিলিকের ব্যাপারটা খোলসা করে বলিনি কিন্ত মা সবই বোঝে। কোন রকমে মাকে এড়িয়ে  হাজারো স্মৃতিতে  দুপুরটা গড়াল। এইত সেদিন আমাদের গ্রাজুয়েশন শেষ হল। শেষদিন সুবলদা মজা করে বললেন ‘আজ থেকে আমার জোড়া  কাস্টমার কমল।‘ তারপরও আমরা সুবলদার রেস্টুরেন্ট গেছি। সেই কোনার টেবিল , হাফপ্লেট  চাওমিন, দুটো কাঁটা  চামচ আর এক থেকে দেড়  ঘণ্টা।

ইংলিশ অনার্সের  মেয়ে ছিল ঝিলিক। ফার্স্ট  ইয়ারের শেষ থেকে টানা তিন বছর প্রেম। গ্রাজুয়েশন শেষের মাস ছয়েক বাদে ও একটা এন.জি.ও তে চাকরি পায়। প্রথম স্যালারির  পর আমায় ট্রীট দিয়েছিল। আমরা প্রথমে বন্ধু ছিলাম তারপর অন্যকিছু তাই কোনদিন মেল ইগোতে  লাগেনি। গত তিন বছর আমি কখনো  ওর ঠোঁটে ঠোঁট রাখিনি। হ্যাঁ, বহুবার হাত ধরে ঘুরেছি। তাতে যৌনতার চেয়ে পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি বেশি ছিল। বোধহয় আমিই  ভুল ছিলাম । এখন তো শুনছি  ওর অফিসে একটা ছেলের সাথেই….

 

সমস্ত অঙ্কই করানো অথচ আমাকে আজও এসে করানো অঙ্কই আবার দিতে হচ্ছে এবং রোজকার মত রাত্রি কয়েক মিনিটের মধ্যেই সেগুলি নামাচ্ছে। টানাটানা নাক চোখ , দুধে আলতা রঙ আর এক রাশ অহংকার নিয়ে টেবিলের ওপাশে বসে আছে রাত্রি মুখার্জী। কেন জানি ওকে প্রথম থেকেই আমার খুব অহংকারী লাগে। গত মাসের একটা ঘটনার  পর থেকে তো ওকে বেশ নোংড়াও  লাগছে। সেদিন একই রকম ক্লাস চলছিল, ও অঙ্ক করছিল আর আমি দেখছিলাম। ঝিলিক তখন অদ্ভুত ব্যবহার শুরু করেছে। তাই চোখ রাত্রির দিকে থাকলেও মন ছিল বহু দূরে। রাত্রি সেটা  লক্ষ্য করে আচমকাই নিজের কামিজ টেনে ঠিক করল। ছিঃ! আমি ওর চেয়ে কতো  বড়, আর ও আমাকে এরকম ভাবলো? ওর প্রতি ধারনাটা সেদিন থেকে আরও তিক্ত হয়েছিল।

 

মাঝের দু-সপ্তাহ সেরকম টিউশন ছিলোনা। সব স্কুলেই পরীক্ষা চলছে। ইতি মধ্যে আমাদের অঞ্চলে আমার ব্রেক-আপ এর খবরটা মোটামুটি  বাসি হয়ে গেছে। আজ সন্ধ্যায় বাড়ি গেছিলাম। মাইনেটা নিলাম আর কাকিমাকে বলে এলাম যে আমি আর আসব না। কাকিমার্  বহু  প্রশ্নের প্রায় যুক্তিযুক্ত উত্তর না দিয়েই চলে এসেছি।

টিউশনটা ছাড়ার কারন   মোটামুটি এরকম –অরুনের বোন  তিতাস রাত্রির ক্লাসমেট। অরুনের  কাছেই শুনলাম আমার ব্রেক-আপের খবরে নাকি ও তিতাসদের চকলেট খাইয়েছে। আমার সাথে রাত্রির কোনদিনই ভাল সম্পর্ক তৈরী হয়নি, হয়ত আমাকে বদ ছেলেও ভাবে। তাই বলে আমার  চরম ক্ষতিতে এতটা আনন্দ। আমার সহ্য হয়নি।

প্রায় তিন সপ্তাহ হল ঝিলিকের সাথে ব্রেক-আপের। এখন মাঝে মাঝেই আমাদের খালের উপর সিমেন্টের ব্রিজটায় চলে আসি। পড়ন্ত  বিকেলের আলোয় সুখের স্মৃতি গুলো হাতড়াই । এই ব্রিজে দাঁড়িয়েই  পরস্পরের পাশে থাকার, সুখ দুঃখ ভাগ করে নেওয়ার কত মুহূর্ত।

ব্রিজের ওপারে একটা নেড়া পোড়া  হয়। কাল দোল। জনা পাঁচেক ছেলে  মন দিয়ে ঘর  বেঁধে  চলেছে। দূর আকাশে এক ঝাঁক  পাখি দল বেধে বাড়ির পথে। ছমাস আগে থেকে দোল নিয়ে  কত প্লান করেছিলাম। আর ঠিক দোলের  আগেই জীবনটা  বেরঙীন হয়ে গেল। এলাকায় আড়ালে আবডালে আমার নাকি ‘দেবদাস’ নাম হয়েছে। টিউশন বাড়িগুলোয়  এনিয়ে একটু উসকুসও শুনেছি।

এরকম কতশত চিন্তা হঠাৎই থেমে গেল ‘স্যার’ বলে একটা ডাকে। ঘুরে যাকে দেখলাম  তাকে দেখার বিন্দুমাত্র কল্পনা  করিনি। রাত্রি – স্কুলের শাড়িতে, সারাদিনের ক্লান্তি আর শেষ বিকেলে আলো যেন ওকে আরও সুন্দর করেছে। শান্ত অথচ দৃঢ় কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল, ‘আমাকে ছাড়লেন কেন? ‘কোন উত্তর দেওয়ার আগেই ও বলল ‘গেস করতে পারছি তিতাসের কাছ থেকে কিছু শুনেছেন তো?’ ‘কেন আমি কি ভুল শুনেছি?’

‘না একদম না, স্যার জানেন আপনাকে ঝিলিকদি কেন ছাড়ল ? মেয়েদের মন বোঝার ক্ষমতা আপনার নেই। আপনি আমাকে যতটা বাজে ভাবেন আমি বোধহয় ততটাও  নই। আপনার ভালোবাসা হারানোয় খুশি হইনি , আমি আমার পছন্দের মানুষকে পাওয়ার নুন্যতম আশায় খুশি হয়েছিলাম। একটু নিঃশ্বাস   নিয়ে বলল, ‘শুনেছিলাম প্রথম প্রেম অভিশপ্ত । তাই বলে শুরুর আগে শেষ হয়ে যাবে এতটা ভাবিনি। ধন্যবাদ স্যার, আমাকে কল্পনা  আর বাস্তবের ফারাক শেখানোর  জন্য।‘ শেষের দিকে গলাটা  যেন একটু কাঁপল, কয়েকটা মুক্ত বিন্দু সাদা গাল বেয়ে নেমে এল। আমার   জন্য কারু চোখে জল আসতে পারে! প্রায় সম্মোহিত অবস্থা থেকে যখন ফিরে এলাম, দেখলাম রাত্রি ধীরে ধীরে ব্রীজ পেরিয়ে মিশে যাচ্ছে।

চিত্রগ্রহণ – পূর্ণেন্দু দে

চিত্রে – রাহুল ঘোষ ও মোনালিসা আচার্য্য

চিত্রগ্রহণ – পূর্ণেন্দু দে

চিত্রে – রাহুল ঘোষ ও মোনালিসা আচার্য্য

Facebook Comments