এ উৎসবের অনেকগুলো রং।  রাধাচূড়ার ডালটা এলিয়ে রয়েছে কৃষ্ণচূড়ার রঙিন কাঁধে। এই নির্ভরতাই  প্রেম। জীবনের প্রাত্যহিক উদযাপন ছেড়ে আল্হাদের আদর। দোল হোলিতে অবশ্য আদরের রং জীবনের পাশাপাশি বাদুড়ে রং এর সাথে সিদ্ধি ভাঙ এর বিচিত্র ককটেলের বেলেল্লাপনা আছে। দোল কি প্রেমের উৎসব ! একসময় চৈত্র মাসের শুক্ল ত্রয়োদশী চতুর্দশী তিথিতে প্রেম দেবতার নামাঙ্কিত মদনোৎসব হতো। আসলে তখন সরস্বতী পড়াশুনোর দিকটাই দেখতেন , প্রেমের বাড়তি দায়িত্ব তাকে নিতে হয় নি। ফেব্রুয়ারির এক গুচ্ছ দিনমালাও আসে নি। ভি ডে তো ভাবনার বাইরে। মদনদেব একাই  দুনিয়ার সব প্রেমের মীমাংসা করছিলেন। এ হেন্ লাভগুরু এখন সীমানার বাইরে।

দোলের পুরো নাম দোলযাত্রা। যে উৎসবে একজন দেবতার সাথে বহু মানুষ তার পিছু পিছু পথ চলেন , সেই উৎসবকে বলা হয় যাত্রা।  যেমন রথের দিন জগন্নাথ বলরাম সুভদ্রাকে নিয়ে রথে বসে পথ চলেন।সাথে আকাশ বাতাস মুখরিত করে হাজার হাজার মানুষ।  তাই নাম হয়েছে রথযাত্রা। আমাদের দুর্গাপুজোয় এমন অবকাশ নেই। তাই দূর্গা যাত্রাও কেউ বলেন না। এবার আসি দোলযাত্রার কথায়।  দোলে তাহলে পথ চলেন কে? অযথা দোল যাত্রা বলতে যাবো কেন ? গবেষকেরা বলছেন চলেন সূর্যদেব। আসলে সূর্যদেবের সেই চলনের জোরেই আমাদের সকলের বেঁচে থাকা। পুজো অর্চনা উৎসব সবই এসেছে আমাদের রোজকার জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে। মানুষ বহু আগেই বুঝতে পেরেছিলো আমাদের বেঁচে থাকা সূর্যের জন্যেই।  সেই আমাদের পরম  দেবতা। সূর্য ঘুরতে  থাকে।বাৎসরিক চলন। যাকে দোলন ও বলা যায়।  বৈদিক ঋষিরা  এই দোলনকে মাথায় রেখে দু দুটি উৎসবের ধারণা দিলেন। একটি দোল , অন্যটি হিন্দোল। এই হিন্দোল কে আমরা ঝুলন বলে থাকি।  এখন আমাদের দেশ উত্তর গোলার্ধে।  ফলে এই বসন্ত পেরিয়েই সূর্যের উত্তুরে পথ চলা।  ধীরে ধীরে গ্রীষ্ম পেরিয়ে বর্ষা আসে। ফসল ফলে। তাছাড়া শীতের দাপট কার ই বা ভালো লাগে। বিশেষ করে তখন তো আর রুম হিটার ছিল না। শীতের দিন কাটতো কষ্টেই।  তারই মাঝে সুস্পষ্ট হতো বসন্তের দিন গোনা।

ধীরে ধীরে প্রকৃতিতে বদল আসে। আলতো  স্বরে কোকিলের ডাক। মনে হয় এ যেন প্রাণের মানুষের জন্য অপেক্ষা।আবার যে আসবে সেও তো আগুন ধরানো বসন্ত। মদনদেবের বিশস্ত অনুচর। আগুন তো শুধু বনে  নয়  ,  আগুন লাগে মনেও । প্রেমের আগুন। রং এর উৎসবতো এমন ঋতু তেই মানায়। আবার ফিরে  যাবো সেই বৈদিক যুগে।  মানুষ অপেক্ষা করছে , কবে বসন্ত আসবে। অপেক্ষা করলেই দেখবেন মানুষ অস্থির হয়ে পরে।  এখনো দেখবেন , ধরুন বাস স্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে আছেন আপনি , মনের মানুষের অপেক্ষায়। একটু পরেই অস্থির হয়ে উঠবেন।  আপনার হাত অচিরেই চলে যাবে মোবাইলে। এটা সেটা ঘাঁটবেন।  ঠিক সেটাই হয়েছিল সেই সময়েও।  মন আনচান করতে করতে মানুষ আচমকা খেয়াল করলো যে আকাশে একটা আজব নক্ষত্র। কিরকম যেন একটা মেষের মতো দেখতে। নাম হলো মেন্টাসুর। সব দোষ  গিয়ে পড়লো তার ঘাড়ে । আচ্ছা , এর জন্যেই তাহলে সূর্য চলতে পারছেন না। তাই সাধের বসন্তের এমন দেরি।একে পুড়িয়ে আপদ বিদেয় করতে হবে। ফাল্গুনী পূর্ণিমার আগের দিন মেড়া পোড়ানো। মেড়া মানে সেই মেষ। যাকে আকাশে দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। সেই দুস্টু অসুর। মেড়া পোড়ানোই নামই কালক্রমে  পাল্টে হলো নেড়া  পোড়ানো।  আমাদের শখের বুড়ির ঘর পোড়ানো। শুকনো পাতা গাছের ডাল  জোর করে আগুন লাগিয়ে দেওয়া। আপদ বিদায় পর্ব। পরের দিন সকালে সূর্য ওঠে। আলো  ছড়িয়ে পরে জীবনে , যে আলোর পথ চেয়ে আমাদের চলা। সূর্যের রং লাল। তাই লাল রঙে , লাল আবিরে একে  অপরকে রাঙিয়ে আমরা আসলে উদযাপন করবো জীবনের জয়যাত্রা। সূর্য তুমি পথ চলো , সাথে সাথে চলি আমরা।  আরো স্পষ্ট করে বললে সূর্য তুমি দোলা খাও , দুলতে থাকো দক্ষিণ থেকে উত্তর , আবার উত্তর থেকে দক্ষিণ , আমরা সাথে সাথে এগিয়ে চলি , এগিয়ে চলুক সভ্যতা। তাই নাম দাঁড়ালো দোলযাত্রা। একে  রঙের উৎসব , তার ওপরে প্রেম মাখা সময় , বিশ্বপ্রেমিক কৃষ্ণ চুপ থাকেন কি করে। নন্দগ্রাম থেকে রাধারাণীর বর্ষনায়  তাকে যেতেই হয়। বিনোদিনীকে রঙের আদরে  রঙিন করতে হবে। কৃষ্ণ একা  তো নয়। কৃষ্ণের সখারাও মেতে ওঠে। প্রেমে মাতোয়ারা হয় গোপিনীরা।  এ সময়ে পরীক্ষার পড়া , কিংবা অফিসের কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকতে নেই।  রবি কবি সাফ সাফ বলে দিয়েছেন ,ওরে গৃহবাসী , খোল দ্বার খোল , লাগলো যে দোল। রুটিন পাল্টে তাই দোলে মাততেই হবে। কবিগুরুর নির্দেশ যে।
Facebook Comments