দেশটা তখন পরাধীন।আজ স্বাধীন দেশেও চাকরির আকাল।সে যুগে কেমন ছিল সহজেই অনুমেয়।গুটিকয়েক পাঞ্জাবী নতুন ভাগ্যের খোঁজে ঘর ছেড়েছিলেন।লক্ষ্য ছিল অন্য দেশে গিয়ে নতুন জীবনের খোঁজ।সে যাত্রার মাধ্যম ছিল একটি জাহাজ।নাম কামাগাতামারু।নাম শুনেই বোঝা যায়, জাহাজটি জাপানি জাহাজ।ভাগ্য বদলের আশায় চাকরির খোঁজে এক সময় বহু মানুষই পাড়ি জমাচ্ছিলেন উত্তর আমেরিকায়।তাদের অধিকাংশই ছিল পাঞ্জাবী।পাঞ্জাবের তৎকালীন বেহাল অর্থনৈতিক দশাকেই এর জন্য দায়ী করেন অনেকে।কানাডার সরকার এই বিষয়টিকে মোটেই ভালোভাবে নেননি।কানাডিয়ান সরকার কানাডায় ভারতীয়দের প্রবেশকে মনে করেছিলেন বাদামি আগ্রাসন।নাম থেকেই সুস্পষ্ট যে, এই ভাবনার মধ্যে ছিল বর্ণবিদ্বেষের গন্ধ।কানাডার সরকার মনে করেছিল এর ফলে ওই দেশের ব্যবসা বাণিজ্যে তাদের একচেটিয়া  কমবে।তারা ব্রিটিশ কলম্বিয়ার নেতৃত্বে এক আজব আইন পাশ করে।নিয়ম হয় হাতে দুশো ডলার না থাকলে, প্রবেশ করা যাবে না কানাডায়।এমনকি তারা বাষ্পীয় ইঞ্জিন চালকদের কাছে চাপ দিতে থেকে যাতে কানাডায় আসার টিকিট না মেলে।
একশো বছর আগে এই আইন কে চ্যালেঞ্জ করে কানাডা পৌঁছানোর চেষ্টা চালিয়েছিলেন বাবা গুরদিত সিং ও তাঁর অসমসাহসী সঙ্গীরা।হংকং থেকে জাপান হয়ে কানাডার ভ্যাঙ্কুবার -এ পৌঁছেছিলেন তাঁরা।তাদের কানাডা যাওয়ার খবর আগে থেকেই পৌঁছেছিল ব্রিটিশদের কাছে।গল্পের ১৯১৪ সালের শুরুর দিকে।হংকং -এর শিখ মন্দিরে থাকতেন ভাই গুরদিত সিং ও তাঁর বন্ধুরা।কোনও নিষেধের তোয়াক্কা না করেই কানাডা যাওয়ার টিকিট বিক্রি শুরু করেছিলো তাঁরা।প্রথমে কড়া নজরদারি।তারপর কামাগাতামারু হংকং ছাড়ার নির্ধারিত দিনের দু’দিন আগে গ্রেপ্তার।তবে এই গ্রেপ্তার বেশিদিন টেকেনি।দ্রুত মুক্তি পান গুরদিত।দেড়শোর মতো যাত্রীসহ হংকং শহরকে বিদায় জানিয়ে এগোতে থাকে কামাগাতামারু।এরপর সাংহাই, মাজী, ইয়োকোহামা থেকে আরও অনেক দেশান্তরি ভারতীয় চেপে বসেন সেই জাহাজে।জাহাজ চলেছে ভ্যাঙ্কুবারের উদ্দেশ্যে।জাহাজ ভর্তি মনে আশা, চোখে স্বপ্ন।অন্যদিকে কানাডার সংবাদপত্রে উত্তেজক খবরের ভিড়.২৩শে মে কামাগাতামারু ভ্যাঙ্কুবারে এসে পৌঁছয়।তাদের প্রতি অর্থ ও নানা সাহায্য নিয়ে হাজির সে দেশের ভারতীয় মহল। হয়তো তারা বুঝতে পেরেছিলো কি ভয়ঙ্কর ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করে আছে কামাগাতামারুর জন্য।কানাডার সরকার মরিয়া, কিছুতেই নামতে দেবেননা ভারতীয়দের। দু’মাস ধরে চললো কড়া বিবাদ।একদিকে কামাগাতামারুর অসহায় যাত্রীরা,যাদের পাশে সেখানকার ভারতীয় সমাজ,যারা সংখ্যায় নগন্য।আর অন্যদিকে ব্রিটিশ কলম্বিয়া সরকার।অনুমতি মিললো মাত্র ২৪ জন যাত্রীর।২৩শে জুলাই কামাগাতামারুর যাত্রা আবার শুরু হল। হতাশ যাত্রীরা।এবার দেশে ফেরার পালা।কোথায় ফিরবেন তারা।ঠিক হলো কলকাতায়।দীর্ঘ লাঞ্ছনা শেষে নিজের দেশের জল-হাওয়া গায়ে মাখার অপেক্ষা শুরু হলো। একের পর এক দিন কাটে।অপেক্ষার প্রহর দীর্ঘতর হয়। অবশেষে কলকাতা বন্দরে পা রাখলো কামাগাতামারু।কিন্তু এ কি স্বদেশ! জাহাজ দ্রুত ঘিরে ফেললো বন্দুকসজ্জিত ইউরোপীয় সৈন্য।দ্রুত বন্দি করা হলো বাবা গুরদীতে সিং ও তার সঙ্গীদের।নিয়ে যাওয়া হলো কলকাতা থেকে ১৭ মাইল দূরে বজবজে।খোঁজ নিয়ে জানা যায় তাদের পাঞ্জাবে পাঠানোর তোড়জোড় করছে ব্রিটিশ।রুখে দাঁড়ায় বাবা গুরদীতে সিং-এর অনুগামীরা।তাদের জোর করা হয় আবার জাহাজে উঠতে।তারপর! তখন ও জালিয়ানওয়ালাবাগের নৃশংসতা দেখেনি দেশ। এই বা কিসে! নিমেষে গুলি ধেয়ে আসতে থাকে যাত্রীদের উদ্দেশ্যে।২৯জন যাত্রী গুলিবিদ্ধ হন সেদিন।২০জন মারা যান। রক্তে ভেজা মাসটা একশোটা বছর পেরিয়ে এলো। কালো দিন গুলো বলতে চায় বহু যুগের ওপার থেকে।কান পাতলে আজও ইতিহাসের ধূসর পাতায় রক্তের ছোপ।
Facebook Comments