বঙ্গে শিল্প আনতে হন্যে সবাই।গত কয়েক দশক ভিনদেশী শিল্পাতারার খোঁজ জব্বর।আর সেই বাজারে নিখোঁজ বাংলার নিজস্ব শিল্পসম্ভার।এবার চলুন ঘুরে আসি ঊনবিংশ শতকের শেষভাগে অথবা বিশ শতকের শুরুর দিকে। দেশটা পরাধীন।এমন অসময়ে শুধু নিজের দুরন্ত প্রতিভা আর উদ্যোগ দিয়েই বলে বলে কিস্তিমাত করেছেন এক বাঙালি।অধুনা বিস্মৃতপ্রায়।নাম হেমেন্দ্রমোহন বোস। জন্ম দেড়শো বছর আগে ১৮৬৪ সালে ময়মনসিংহ জেলার কোনো এক গ্রামে। ছিলেন ডাক্তার।এক দুর্ঘটনায় চোখ হারিয়ে ডাক্তারি ছাড়লেন।এরপরই শুরু হলো এক সত্যিকারের রূপকথা।

গন্ধে মাতোয়ারা
বাঙালির প্রথম পারফিউম।ব্রিটিশ ভাবতো এদেশের লোক নেটিফ।ভারতীয় গায়ে তীব্র দুর্গন্ধ, থাকে নোংড়া জায়গায়।বোসবাবু এমন পারফিউম বানালেন এ দেশ তো বটেই সাহেব সুবোদের বউরাও বায়না ধরলো – বোসবাবুর পারফিউম চাই.এখানেই শেষ নয়। বরং শুরু।এলো কুন্তলিন নাম মাথার তেল। সে যুগেও সেই তেলের ব্র্যান্ডিং করতে বোসবাবু চালু করলেন কুন্তলিন পুরষ্কার।সাহিত্যে নবোদিতদের জন্যে।সেই পুরষ্কার পেয়েছিলেন জগদীশ বোস এবং শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়।
 
বাই – সাইকেল
বিদেশ থেকে বই – সাইকেল আনিয়ে সেই সাইকেলের ভারতীয় মডেল বানিয়ে ফেললেন।আবার সুপারহিট।জানা যায় বই – সাইকেলে চড়ে সকালের মিঠে রোদে হেমেন্দ্রমোহনের সাথে গড়ের মাঠে হাওয়া খেতে যেতেন আচার্য প্রফুল্ল চান্দ্রা রায়, স্যার নীলরতন সরকার, জগদীশচন্দ্র বোস, এমনকি আচার্য – পত্নী অবলা বসু ও তাদের দোলে যোগ দিয়েছিলেন।গড়ের মাঠের সকালের হাওয়ায় মিশে যেত কয়েকজন বাঙালি সিংহ পুরুষের নিঃশ্বাস।
 
মোটর মতলব
মোটর ব্যবসায় প্রথম সফল ভারতীয়।পরাধীন দেশে স্বাধীনতার আগুন জ্বালতে গেলে সে আগুন জ্বালাতে হবে মানুষের মনে। মেরুদন্ড শক্ত করতে দরকার ছিল বোসবাবুদের মতো বাঙালির।তৈরী করলেন গ্রেট ইস্টার্ন মোটর কোম্পানি।ফাটাফাটি সফল। তুখোর ব্যবসায়িক বুদ্ধি।সাহেব সুবোরা মোটেও খুশি হন নি। সেই আগুন জ্বলা সময়ে নিজের কারখানায় স্বদেশী নামক একটি গাড়ি বানিয়ে তিনি সারা কলকাতাময় চক্কর কাটতেন। পথ চলতি বাঙালিকে সাহস দিতেন। স্বদেশী নামক গাড়িতে সওয়ারি হয়ে লালমুখো সাহেবদের পাশাপাশি গাড়ি ছুটিয়ে সারা কলকাতা সংক্রামিত করতেন স্বদেশ চেতনা।
কণ্ঠ ধরে রেখো
স্বদেশী ভাবনায় জ্বলছে দেশ। স্বদেশী গান লিখছেন রবি ঠাকুর।হেমেন বোস চুপ করে থাকেন নি। প্রথম নিজের স্টুডিওতে রেকর্ড করেছিলেন রবি ঠাকুরের মোহময় গলা। রবীন্দ্রনাথ তখন তরুণ।বঙ্কিমের বন্দেমাতরম রবীন্দ্রনাথের গলায় সহ আরও অনেক গান রেকর্ড করেছিলেন তাঁর ফোনোগ্রাফ যন্ত্রে।নাম দিলাম এইচ বোসেস রেকর্ডস। বলা বাহুল্য সেই ডিস্কও তুমুল খ্যাতি পেলো সে সময়ে।স্বদেশী গান স্বদেশ বিদেশ মাতিয়ে তুলল এই শিল্প রসিকের কর্মকান্ডে।
মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে
 তখন বিদেশী কোম্পানির বিজ্ঞাপনের ঠেলায় স্বদেশীরা মুষ্টিমেয়।হেমেন বোস এখানেও সবার সেরা,অভিনব সব বিজ্ঞাপন বানিয়েছেন সে যুগেও।সেরকমই একটি দুরন্ত বিজ্ঞাপনী ছড়া দিয়ে শেষ করি – “কেশে মাখো কুন্তলিন অঙ্গবাসে দেলখোস/ সুবাসে মাতাও ধরা করো এইচ বোস।”
#janamanas
Facebook Comments